
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
‘মা, তুই কবে আসবি? একবার তোকে কাছে থেকে ছুঁয়ে দেখব।’ ৯৫ বছর বয়সী তোমেজ উদ্দিন হাওলাদারের কণ্ঠে এমন আকুতি। ৩২ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মেয়ে আছিয়ার সন্ধান মিলেছে পাকিস্তানে। ভিডিও কলে বাবা-মেয়ের যোগাযোগ হলেও এখনো একে অন্যকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুর আগে একবার ছুঁয়ে দেখতে চান বৃদ্ধ বাবা।
আছিয়া বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর এম. বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৯৪ সালে ১৮ বছর বয়সে ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকা অবস্থায় বরগুনায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পায়নি পরিবার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অভাবের কারণে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যান তোমেজ উদ্দিনের পরিবার। মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তাঁরা। তোমেজ উদ্দিন দিনমজুরের কাজ করতেন। ১৯৯৪ সালের এক বিকেলে বরগুনায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন আছিয়া। সদরঘাট এলাকায় এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই নারী তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সঙ্গে নিয়ে যান।
আছিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাঁকে অচেতন করে প্রথমে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে একটি ঘরে ১০ থেকে ১২ দিন আটকে রাখার পর কয়েকজনের সঙ্গে তাঁকে পাকিস্তানের মোজাফফরনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপির বিনিময়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
পাকিস্তানেই আছিয়ার সংসার গড়ে ওঠে। তাঁর স্বামী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। তাঁদের ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশে থাকা বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনদের কথা আরও বেশি মনে পড়তে থাকে তাঁর। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনোভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছিয়ার পরিবারের সন্ধান পান তাঁর বড় মেয়ে। মায়ের পরিচয় ও বাংলাদেশে থাকা নানার ঠিকানা উল্লেখ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন তিনি। পরে পোস্টটি বাংলাদেশের একটি নিখোঁজসংক্রান্ত পেজে শেয়ার হলে তা নজরে আসে আছিয়াদের একসময়কার পরিচিত রিয়াজ উদ্দিনের।
রিয়াজ উদ্দিন বিষয়টি যাচাই করে আছিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তোমেজ উদ্দিন, তাঁর ছেলে মোস্তফা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ছবি আছিয়ার কাছে পাঠানো হয়। ছবি দেখে পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন তিনি।
গত ২০ জুলাই প্রথমবার ভিডিও কলে ৩২ বছর পর বাবার সঙ্গে কথা বলেন আছিয়া। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে বাবা-মেয়ের কথা হচ্ছে। মোবাইলের পর্দায় মেয়ের মুখ দেখে কখনো হাসছেন তোমেজ উদ্দিন, আবার কখনো আবেগে চোখের পানি মুছছেন।
আছিয়া বলেন, ‘আমি অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির কোনো খোঁজ নিতে পারিনি। এখন পরিবারের সন্ধান পেয়েছি। আমি আমার বাবাকে দেখতে চাই। দেশে ফিরতে চাই। এজন্য বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চাই।’
তিনি জানান, বাংলাদেশে ফেরার জন্য পাকিস্তানে পাসপোর্টের আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাঁর বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও সেই সামর্থ্য নেই। তাই দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় দুই দেশের সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা বলেন, ‘৩২ বছরে আমরা ভেবেছিলাম বোন আর বেঁচে নেই। হঠাৎ তার সন্ধান পেয়েছি। সে বেঁচে আছে- এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। এখন আমরা চাই, সে যেন দেশে ফিরে আসতে পারে। সরকার যেন আমাদের সহযোগিতা করে।’
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছিয়ার নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দেখে তিনি বিষয়টি যাচাই করেন। পরে আছিয়ার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন। তাঁর ফোনের মাধ্যমেই বর্তমানে দুই পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনতেও সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তোমেজ উদ্দিন বলেন, ‘মরার আগে আমার আছিয়ারে একবার দেখতে চাই। আল্লাহ আমার মেয়ের খোঁজ দিছে। আমি চাই, মরার আগে ওরে একটু ছুঁইয়া দেখতে। আমার মেয়েরে আপনারা আইন্না দেন।’
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মিজ তাছলিমা আক্তার বলেন, আছিয়া বাংলাদেশের নাগরিক- এমন কোনো প্রমাণপত্র থাকলে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র না থাকলেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩২ বছর পর প্রযুক্তির মাধ্যমে বাবা-মেয়ের যোগাযোগ ফিরলেও ঘোচেনি দূরত্ব। প্রতিদিন মোবাইলের পর্দায় একে অন্যকে দেখা ও কথা বলা গেলেও বাবার হাতে এখনো পৌঁছায়নি মেয়ের হাত। তাই ৯৫ বছরের তোমেজ উদ্দিনের এখন একটাই অপেক্ষা- কবে পর্দার ওপাশের মেয়েটি সত্যিই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াবে। আর আছিয়ার অপেক্ষা- কবে দেশে ফিরে জড়িয়ে ধরতে পারবেন বাবাকে।