
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বেলুয়া নদীর বুকজুড়ে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ছে। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় কৃষিপণ্য, আবার কোনো নৌকাই যেন হয়ে উঠেছে ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলছে দরদাম, কেনাবেচা আর ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটার এই ভাসমান হাটে সপ্তাহে দুদিন এমন দৃশ্য দেখা যায়। শনিবার ও মঙ্গলবার ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদীর ওপরই বসে জমজমাট এই বাজার। শত শত নৌকা আর ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে দূর থেকে মনে হয়, নদীর বুকেই যেন গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক জনপদ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয়। তরমুজের মৌসুমে বেচাকেনার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা।
নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে এখানে নিয়ে আসেন তাঁদের উৎপাদিত পণ্য। পরে পাইকাররা এসব পণ্য কিনে নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে নিয়ে যান।
এ হাটে শুধু শাকসবজি নয়, পাওয়া যায় সবজির চারা, নারকেল, তরমুজ, বিভিন্ন শস্য, মিষ্টি কুমড়া, শ্যাওলা, দুলালী লতাসহ কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণ। এমনকি মিষ্টি পান থেকে শুরু করে সকালের নাস্তা ও ভাতও মেলে এই ভাসমান বাজারে।
ভৌগোলিক বাস্তবতায় এখানকার মানুষের অন্যতম প্রধান বাহন নৌকা। তাই বিক্রেতারা যেমন নৌকা নিয়ে পণ্য নিয়ে আসেন, ক্রেতারাও নৌকা নিয়েই আসেন কেনাকাটা করতে। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকেই তৈরি হয় এমন এক বাজার, যেখানে নৌকাই দোকান, নৌকাই ক্রেতার বাহন, আবার নৌকাই পণ্য পরিবহনের মাধ্যম।
কৃষিপণ্য বিক্রেতা ৫৬ বছর বয়সী জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এই বাজারে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ব্যবসা করতে আসে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। কৃষকেরা নৌকায় করে বিভিন্ন সবজি নিয়ে আসেন। পাইকাররা কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে ট্রলারে করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।’
ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভাসমান এই হাটে কাঁচামাল থেকে সবকিছু পাওয়া যায়। আমি অনেক সবজি কিনেছি। ট্রলারে করে নিয়ে আমার বাড়ির কাছের একটি হাটে বিক্রি করব।’
হাটে শ্যাওলা বিক্রি করেন রাজীব শেখ। তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী মোল্লারহাট এলাকা থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসছি। শ্যাওলার কুড়ি ১৫০ টাকা করে বিক্রি করি। মোটামুটি বেচাবিক্রি করে সংসার চালাতে পারি।’
নৌকা ভর্তি মিষ্টি কুমড়া নিয়ে হাটে এসেছিলেন কৃষক রুহুল আমিন। ভালো দাম পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
রুহুল আমিন বলেন, ‘অনেকগুলো মিষ্টি কুমড়া নিয়ে আসছি বিক্রির জন্য। কয়েকজন দাম বলেছে, কিন্তু দিইনি। যার কাছে ভালো দাম পাব, তার কাছেই বিক্রি করব। এর আগের হাটে কচু নিয়ে এসেছিলাম। এই হাটে প্রায় কোটি টাকার বেচাবিক্রি হয়।’
জলকেন্দ্রিক এই বাজারব্যবস্থা আর নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার কারণে বৈঠাকাটার ভাসমান হাটকে স্থানীয়রা ‘বাংলার ভেনিস’ বলে থাকেন। ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে এ হাটের মিলও খুঁজে পান অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দা জালিস হাওলাদার বলেন, ‘এই বাজার বাংলার ভেনিসখ্যাত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসেন। বিদেশি পর্যটকেরাও আসেন। তবে এখানে যারা ঘুরতে আসেন, তাঁদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রাস্তাঘাট একদম ভালো নয়। রাস্তাঘাট ও আবাসন সুবিধা ভালো করা হলে আরও বেশি পর্যটক আসবেন। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।’
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, ‘ভাসমান এই হাটকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। বিদেশি পর্যটকেরাও এখানে ঘুরতে আসেন। নারকেল, তরমুজ, শাকসবজি, সবজির চারা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য এখানে বিক্রি হয়। পাশাপাশি সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত শ্যাওলা, দুলালী লতাসহ বিভিন্ন উপকরণও পাওয়া যায়। খুব সকালে পাইকাররা পণ্য কিনে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান।’
বেলুয়া নদীর বুকের এই হাটকে ঘিরে বৈঠাকাটায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ বাজারও গড়ে উঠেছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যেমন এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি নদীর ওপর গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী বাজার দেখতে ছুটে আসেন দেশের নানা এলাকার পর্যটক।
কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকজুড়ে তৈরি হওয়া এই ভাসমান বাজার তাই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি নাজিরপুরের কৃষি, নদী ও মানুষের জীবনযাত্রার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।