
এম মজিবুল হক কিসলু, বরগুনা থেকে
বরগুনা শহরের পশ্চিম প্রান্ত পেরিয়ে বিষখালী নদীর তীরে গেলে চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা একটি পর্যটনকেন্দ্র। চারপাশে নানা ধরনের গাছপালা, কাশবন, হোগলা ও নলখাগড়া। নদীর দিক থেকে আসা বাতাসের সঙ্গে শোনা যায় পাখির ডাক। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের আনাগোনায় জায়গাটি বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এটি সুরঞ্জনা ট্যুরিজম ইকোপার্ক। সাংবাদিক ও আইনজীবী সোহেল হাফিজের ব্যক্তি উদ্যোগে ২০২০ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। ছোট পরিসরে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ এখানে আসেন।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বরগুনার এই পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃতিনির্ভর পরিবেশই সুরঞ্জনার প্রধান আকর্ষণ।
পেশার পাশাপাশি ভিন্ন উদ্যোগ
সোহেল হাফিজ সাংবাদিকতা ও আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ থেকেই বিষখালীর তীরে সুরঞ্জনা গড়ে তোলেন তিনি।
সোহেল হাফিজ বলেন, ‘আমি সাংবাদিকতা করি, আইন পেশার সঙ্গেও যুক্ত। তারপরও সবকিছু ছেড়ে এখানে পড়ে আছি। কোনো ব্যবসায়িক মোহ থেকে নয়, মানুষের ভালোবাসার কারণে। যখন দেখি একটি পরিবার এখানে এসে কয়েক ঘণ্টা প্রকৃতির মধ্যে থেকে প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছে, শিশুরা পাখি দেখছে, গাছ চিনছে, নদীর বাতাস উপভোগ করছে, পদ্ম ফুল দুলছে, তখন মনে হয়, আমার এই শ্রম বৃথা যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘সুরঞ্জনা আমার কাছে শুধু একটি রিসোর্ট নয়। এটি প্রকৃতির কাছে মানুষের ফিরে আসার একটি ছোট্ট দরজা। আমি চাই, মানুষ এখানে এসে শুধু আনন্দ নিয়ে ফিরে যাবে না। প্রকৃতিকে ভালোবাসার একটি শিক্ষাও নিয়ে ফিরবে।’

প্রায় ৫০ প্রজাতির গাছ
সুরঞ্জনায় প্রায় ৫০ প্রজাতির সহস্রাধিক দেশীয় ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। এসব গাছের পাশাপাশি গোল, হোগলা, নলখাগড়া ও কাশবন রয়েছে।
গাছগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির আনাগোনাও বাড়ছে। এখানে পাখির অভয়াশ্রম করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বৃক্ষ পুনর্বাসন কেন্দ্র।
উদ্যোক্তার মতে, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু পর্যটকদের আকৃষ্ট করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করা।
রয়েছে ছয়টি কটেজ
সুরঞ্জনায় শুধু দিনের বেলায় ঘোরার ব্যবস্থা নয়, রাত কাটানোরও সুযোগ রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও সাধারণ সুবিধার ছয়টি কটেজ রয়েছে এখানে।
পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে থাকার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ছুটির দিনে বাড়ে ভিড়
সুরঞ্জনায় প্রতিদিনই দর্শনার্থী আসেন। কেউ নদীর পাড়ে বসে সময় কাটান, কেউ ঘুরে দেখেন গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। শিশুদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোর উপস্থিতিও চোখে পড়ে।
বিশেষ করে ছুটির দিন, দুই ঈদ ও পূজার সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে। বিকেলের দিকে নদীর পাড়, কাশবন ও সবুজ পরিবেশে মানুষের উপস্থিতি আরও বেশি দেখা যায়।

সামাজিক আয়োজনের সুবিধা
সুরঞ্জনায় রয়েছে ‘গাঙচিল’ মিলনায়তন। এখানে মিটিং, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, বিয়ে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ও পুনর্মিলনীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করা যায়।
প্রকৃতির পরিবেশের পাশাপাশি এসব আয়োজনের সুযোগ থাকায় স্থানীয়দের কাছেও জায়গাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে।
বরগুনার পর্যটন নিয়ে স্বপ্ন
সোহেল হাফিজ বলেন, ‘আমাদের বরগুনার প্রকৃতি কারও চেয়ে কম নয়। আমাদের নদী আছে, সমুদ্র আছে, বন আছে, পাখি আছে, জীববৈচিত্র্য আছে। দরকার শুধু প্রকৃতিকে নষ্ট না করে তাকে ভালোবেসে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা। সুরঞ্জনা সেই বড় স্বপ্নেরই ছোট্ট একটি অংশ।’
বিষখালী নদীর তীরে গড়ে ওঠা সুরঞ্জনা এখনো বড় কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। তবে স্থানীয় মানুষের বিনোদন ও অবসর কাটানোর একটি জায়গা হিসেবে এর পরিচিতি বাড়ছে। প্রকৃতির পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে এই উদ্যোগ কতটা এগিয়ে যেতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।