
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ডেপুটেশন বাণিজ্য এবং দাপ্তরিক দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের একটি অংশ ও একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, শিক্ষক সংকট থাকা বিদ্যালয়ে যথাযথ পদায়ন না করা এবং অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শিক্ষক ডেপুটেশন, অবসর-সংক্রান্ত নথি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ঋণ আবেদন, টিএ বিল ও পেনশনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বরাদ্দ বাস্তবায়নেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলার বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শিক্ষক সংকট থাকলেও সেখানে নতুন শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে পূর্ব পাটুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র দুজন। চর গঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫১ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন দুজন শিক্ষক। একইভাবে মধ্য পাটুয়া, গোলবুনিয়া, চরপাড়া পক্ষীয়া পাড়া, বৌলতলী সৈয়দপুর ও পশ্চিম ধানখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকট রয়েছে।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা কিছু বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত শিক্ষক সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, এ ধরনের ডেপুটেশন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে।
গোলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বাদল বলেন, ‘লাইজু আখতারকে ডেপুটেশনে অন্যত্র পাঠানোয় এখন মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির ১০২ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতে হচ্ছে। শিক্ষিকা লাইজু আখতার শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডেপুটেশন নিয়েছেন।’
দক্ষিণ-পূর্ব ছোট বালিয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে ১২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষকের ছয়টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন চারজন। এর মধ্যে একজন ডেপুটেশনে অন্য বিদ্যালয়ে যান এবং অপর একজন এখানে আসেন। এটা কীভাবে হয়, তা সবাই বোঝে।’
ডেপুটেশনে যাওয়া শিক্ষক বৃষ্টিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। অপর শিক্ষক সুস্মিতা মিত্রের পরিবারের দাবি, কোনো তদ্বির ছাড়াই তার ডেপুটেশন হয়েছে।
পক্ষীয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসরুমা পারভীন বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর অসুস্থ অবস্থায় ডেপুটেশন চেয়ে অফিসে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার আবেদন অনুমোদন হয়নি।’
এদিকে, উপজেলা শিক্ষা অফিসের অনুমতি ছাড়াই দুই শিক্ষকের বিদেশে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে কার্যকর তদারকি নেই বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা অফিসের হাজিরা খাতা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মে ২০২৬ মাসে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগম ১৪ তারিখ পর্যন্ত একদিনে স্বাক্ষর করেছেন। এছাড়া ২৩ জুনের হাজিরা খাতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষরের ঘর ফাঁকা থাকলেও পরদিন তা পূরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘আমার সঙ্গে এখন অফিসের যোগাযোগ কম। তাই অনেক তথ্যই আমার কাছে নেই। তবে অফিস সম্পর্কে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ শুনি।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘কোনো শিক্ষক বলতে পারবেন না যে, আমি কারও কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছি। উন্নয়ন বরাদ্দের কোনো পার্সেন্টেজ নেওয়ার বিষয়েও আমি কিছু জানি না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগম বলেন, ‘ক্ষুদ্র মেরামত, স্লিপ, ইমার্জেন্সি ইন এডুকেশন ও নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কারের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, আগে সেটি খোঁজ নিন। এরপর আপনার সঙ্গে কথা বলব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ ডেপুটেশন আগের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিয়েছেন। আমার সময় দু-একটি হয়েছে, তাও বিভিন্ন নেতার সুপারিশে। আমার অফিস কারও কাছ থেকে এক কাপ চাও খায়নি।’
জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাসুদ করিম বলেন, ‘আপনার কাছ থেকেই অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানলাম। বিষয়টি আমাকে কেউ অবগত করেনি। অভিযোগ সত্য হলে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আমি আকস্মিক পরিদর্শনে কলাপাড়ায় যাব এবং সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব বিদ্যালয়ে মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে, বিষয়টি জানা থাকলে সেখানে যেকোনো উপায়ে ডেপুটেশনের মাধ্যমে শিক্ষক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো।’