
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভোলা
পাঁচ বছরের শিশুসন্তানকে ২৫ বছর বয়সী যুবক, দুই বছর বয়সী আরেক সন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্ত্রীকে বিবাহিত দেখিয়ে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, নিজের ও বাবার বয়স একই দেখানো, স্ত্রীর নাম পরিবর্তন এবং বাবার পরিচয় গোপন করে নামে-বেনামে চরফ্যাশনের বিভিন্ন মৌজায় ৩০ একরেরও বেশি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার পর নীতিমালা লঙ্ঘন করে এসব জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে স্থানীয়দের কাছে বিক্রিও করেছেন মুসফিকুর। পাশাপাশি সরকারি ‘ক’ তালিকাভুক্ত বিপুল পরিমাণ ভিপি জমি জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের নামে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২৫ সালে চরফ্যাশনের চর নীলকমল মৌজার ২৭ একর ভিপি জমির আটটি নামজারি বাতিল করা হলেও অভিযুক্ত ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকা, নুরাবাদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভূমি অফিসে চাকরির সুযোগ কাজে লাগিয়ে চরফ্যাশনের বিভিন্ন মৌজায় নামে-বেনামে দেড় একর করে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন মুসফিকুর। কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী বন্দোবস্ত পাওয়া জমি বিক্রি, দান বা অন্য কোনো উপায়ে হস্তান্তর নিষিদ্ধ। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এসব জমি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে জমি বন্দোবস্ত
মুসফিকুরের বন্দোবস্ত নেওয়া ছয়টি জমির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০১ সালে নিজেকে নদীভাঙনে ভূমিহীন দাবি করে চরফ্যাশনের দক্ষিণ চর আইচা মৌজায় দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেন তিনি। ২০০৪ সালে তার ছেলে মাহফুজুর রহমানের নামে চর কচ্ছপিয়া মৌজায় আরও দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার সময় পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মাহফুজুর রহমানকে ২৫ বছর বয়সী যুবক এবং ২০ বছর বয়সী স্ত্রীকে বিবাহিত দেখানো হয়। একইভাবে দুই বছর বয়সী আরেক ছেলেকেও প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে ছেলের ডাকনাম মো. রিমনের নামে দেড় একর, ভগ্নিপতি আবুল কাশেমের নামে দেড় একর, নিজের নাম পরিবর্তন করে মো. মোশারেফের নামে দেড় একর এবং স্কুলশিক্ষক বাবা মো. মফিজুর রহমানের নামে দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথিতে নিজের ও বাবার বয়স একই দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যেক বন্দোবস্তের আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দৌলতখান উল্লেখ করা হয়েছে। নদীভাঙনে ভূমিহীন হয়েছেন- এমন তথ্য দিয়ে তাদের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়।
বসতবাড়ির জমি দখলের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজের অভিযোগ, মুসফিকুর তার ছেলে মাহফুজুর রহমানের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়ে তার বসতবাড়ির ২৬ শতাংশ জমি জোর করে দখল করেছেন। জমিসংক্রান্ত বিষয়ে মুসফিকুরের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে বেশ কয়েকবার থানায় নিয়ে আটকে রাখে বলেও দাবি করেন সিরাজ।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ১৯৮৪ সালে ডায়োসিসন ট্রাস্ট অ্যাসোসিয়েশন, চার্চ অব বাংলাদেশ চর কচ্ছপিয়া মৌজায় প্রায় চার একর জমিতে ৫৪টি অসহায় ও ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে। সেই থেকে পরিবারগুলো সেখানে বসবাস করে আসছে। ওই জমির একটি অংশও মুসফিকুর তার ছেলের নামে বন্দোবস্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেখান থেকে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়।
চার্চ অব বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. ছায়েদ ফরাজী বলেন, ‘১৯৮৪ সাল থেকে চার্চ অব বাংলাদেশের দেওয়া জমিতে আমরা বসবাস করে আসছি। ২০১৫ সালের পর তহশিলদার মুসফিক জমি দাবি করেন। এখনো তার পক্ষ হয়ে স্থানীয় কিছু লোক এসে জমি দাবি করেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা হানিফ বয়াতী বলেন, ‘আমরা ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাসজমিতে বসবাস করছি। তবে আমাদের নামে কোনো কাগজপত্র নেই। প্রায় এক দশক আগে তহশিলদার মুসফিক জমিটি তার ছেলে মাহফুজের নামে বন্দোবস্ত নেন। পরে তিনি আমাদের কাছে ৩২ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে দুই লাখ টাকা নিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমিটি কিনতে বাধ্য করা হয়েছে।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান আখন, মো. রফিকুল ইসলাম, হানিফ বয়াতী ও মো. মোজ্জাল।
ভিপি জমির নামজারিতে ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ
শুধু খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার অভিযোগই নয়, চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে সরকারি ‘ক’ তালিকাভুক্ত ভিপি জমি জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে মুসফিকুরের বিরুদ্ধে।
এসব নামজারির আটটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনলাইনে জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দেওয়া হয়নি। এরপরও তৎকালীন চরফ্যাশন উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ সালেক মূহিদ নামজারিগুলো অনুমোদন করেন।
আবেদনকারীদের মধ্যে নীলকমল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদ ও তার ভাতিজা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, তারা দালালের মাধ্যমে আটজনের নামে ১১ একর জমির নামজারির আবেদন করেন। ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কক্ষে থাকা আবু সাইদ নামের এক ব্যক্তিকে নামজারির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দেন তারা। পরে জমির খাজনা দিতে গিয়ে জানতে পারেন, নামজারিগুলো বাতিল করা হয়েছে। তবে দালালের মাধ্যমে দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা আর ফেরত পাননি।
কোনো কাগজপত্র ছাড়াই সরকারি বিপুল পরিমাণ ভিপি জমি জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের নামে নামজারি করার প্রমাণ পাওয়ার পরও মুসফিকুরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
যা বলছেন অভিযুক্ত ও কর্মকর্তারা
অভিযোগ অস্বীকার করে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি চরফ্যাশনে কোনো খাসজমি বন্দোবস্ত নিইনি।’ বন্দোবস্ত নেওয়া জমির কাগজপত্র দেখানো হলে তিনি সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চেনেন না বলেও দাবি করেন। ভিপি জমির নামজারির ক্ষেত্রে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ভুলক্রমে নামজারি হওয়ায় পরে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন বলেন, তথ্য গোপন করে সরকারি জমি বন্দোবস্ত নেওয়া হলে বন্দোবস্ত বাতিলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সরকারি ভিপি জমি নামজারির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসার আগে এসব নামজারি হয়েছে। আগের এসিল্যান্ড যাওয়ার সময়ই সেগুলো বাতিলের জন্য আদেশ দিয়ে গেছেন। পরে আমি যোগ দেওয়ার পর অনলাইন থেকে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর নিজের ও পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনের নামে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া গুরুতর অন্যায়। কোনো সরকারি কর্মচারী নিজেকে ভূমিহীন বলতে পারবেন না। এটি নীতিমালাবিরোধী। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মুসফিকুরের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ বিষয়ে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’