সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)
তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশের অভয়ারণ্য। এই নদীর কোথায় জাল ফেললে ইলিশ মিলবে, তা ভালোভাবেই জানেন বাউফলের জেলেরা। কিন্তু ভরা মৌসুমের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই চেনা নদীতে আশানুরূপ ইলিশের দেখা নেই। এতে বিপাকে পড়েছেন নদীনির্ভর হাজারো জেলে। নৌকা-জাল কেনার ঋণ, এনজিওর কিস্তি আর আড়তদারদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।
বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর চরবেরেট গ্রামের জেলে আখের আলী খাঁ (৫৫)। ছেলে সোহেলকে (২০) সঙ্গে নিয়ে তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ শিকার করেন তিনি। প্রতিবছর ইলিশের মৌসুম শুরুর আগে নৌকা ও জাল কেনা কিংবা মেরামতের জন্য ঋণ করেন। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ শিকার করে সেই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধের পর যা থাকে, তা দিয়ে চলে সংসার।
কিন্তু এবার সেই হিসাব যেন মিলছে না আখের আলীর। তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর কোথায় কতটা ইলিশ পাওয়া যায়, তা তাঁর নখদর্পণে। অথচ নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে বারবার জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছেন না।
আখের আলী বলেন, আমাদের এলাকাটি ইলিশের অভয়ারণ্য। কিন্তু এবার এখানেও ইলিশ খুব কম। ভরা মৌসুমের দুই মাস পার হয়ে তিন মাস হতে চললেও আশানুরূপ ইলিশ পাইনি। এনজিওর ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। মহাজনের দাদনের টাকাও আছে। এখন এসব টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, আর সংসারই বা কীভাবে চালাব-সেই চিন্তায় আছি।
শুধু আখের আলী নন, একই দুশ্চিন্তায় বাউফলের ৫ হাজার ৫২১ জন ইলিশনির্ভর জেলে। তাঁদের অভিযোগ, ইলিশের ভরা মৌসুমেও তেঁতুলিয়ার ১০০ কিলোমিটার অভয়ারণ্য এলাকায় জাল ফেললে আগের মতো ইলিশ মিলছে না।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের জুন ও জুলাই-দুই মাসে বাউফলে ইলিশ আহরিত হয়েছে ৫১১ মেট্রিক টন। গত মৌসুমের একই সময়ে আহরণ হয়েছিল ৮৮৩ দশমিক ২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এবার দুই মাসে আগের মৌসুমের তুলনায় ৩৭২ দশমিক ২ মেট্রিক টন কম ইলিশ আহরিত হয়েছে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশের মৌসুম শুরুর আগেই অধিকাংশ জেলেকে নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য ঋণ করতে হয়। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নেন, আবার কেউ আড়তদার বা মহাজনের কাছ থেকে ইলিশ দেওয়ার শর্তে দাদন নেন। মৌসুমে পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় এখন সেই ঋণ ও দাদন পরিশোধ নিয়েই তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
তেঁতুলিয়া নদীর তীরের চরমিয়াজান ও চরবেরেট এলাকায় গিয়ে কথা হয় কয়েকজন জেলের সঙ্গে। তাঁদের প্রায় সবার কথাতেই উঠে আসে আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ার হতাশা। নদীতে দীর্ঘ সময় জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় অনেকেই সংসারের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
চরমিয়াজান এলাকার জেলে ইসতাক ভূঁইয়া (৪০) চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর ছেলে রাকিব (১০) ও মেয়ে সুমাইয়া (১২) স্কুলে পড়ে। মাছ ধরার আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার।
জেলে ইসতাক বলেন, ‘আমার স্ত্রী এনজিও থেকে ঋণ আনছে। বাজারের আড়তদারদের কাছ থেকেও ইলিশ দেওয়ার কথা কইয়া দাদন নিছি। ওই টাকা দিয়া নৌকা-জাল করছি। এখন এনজিওর কিস্তির টাকা, তার সঙ্গে মহাজনের দাদন। নদীতে গিয়া যে পরিমাণ ইলিশ পাই, তাতে সংসারই চলে না। ধারদেনা শোধ করুম কেমনে?’
তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিবছর নভেম্বর মাসে ওই এলাকায় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার আগে পর্যাপ্ত ইলিশ না পেলে জেলেদের সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাউফল উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ইলিশের মৌসুমের সবে দুই মাস শেষ হয়েছে। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতে নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে। জেলেরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আমরা আশা করছি।