
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, তালতলী (বরগুনা)
বরগুনার তালতলীতে উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে পরিচিত টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রকাশ্যে গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কয়েকটি চোরাইচক্র নিয়মিত বনের মূল্যবান গাছ কেটে নদীপথে পাচার করছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা উল্টো গাছ কাটার মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এ ছাড়া বন উজাড়ের খবর প্রকাশ না করতে সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টেংরাগিরি বনাঞ্চলের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এ বন একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। ১৯২৭ সালের বন আইনের জরিপ অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৭ সালে এ বনাঞ্চলের নামকরণ করা হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল।
এ বনে গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। পাশাপাশি কাঠবিড়ালি, বানর, ৪০ প্রজাতির সাপ, সজারু, শূকর, কচ্ছপ, শেয়াল ও বনমোরগসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই বনাঞ্চল।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজে ঘেরা টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গাছ কাটা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত এ বনাঞ্চলের ছকিনা বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই সম্প্রতি দিনে গাছ কাটার দৃশ্য দেখা গেছে। কেটে নেওয়া গাছ ট্রলারে বেঁধে নদীপথে পাচার করা হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে নলবুনিয়া বিট কার্যালয়সংলগ্ন এলাকাতেও। পর্যটনকেন্দ্র শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত এলাকা থেকে একের পর এক মূল্যবান গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, চক্রটি রাতের আঁধারে কাঠ পাচারের পাশাপাশি অনেক গাছ কেটে বনের ভেতর ফেলে রাখে। পরে সুযোগমতো সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, গাছ কাটার আলামত ও প্রমাণ মুছে ফেলতে কেটে নেওয়া গাছের গোড়া ও শিকড়ও উপড়ে ফেলা হচ্ছে। শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার বন ঘুরে গত তিন থেকে চার দিনে দুই শতাধিক গাছ কেটে নেওয়ার চিত্র দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত ও বাবুল হাওলাদার বলেন, চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও আমরা কিছু বলতে পারছি না। গাছ কাটার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে বন বিভাগের কর্মকর্তারা উল্টো গাছ কাটার মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখান। এ কারণে আতঙ্কে প্রতিবাদ করার সাহস হারাচ্ছেন স্থানীয়রা।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, টেংরাগিরি বনাঞ্চলটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাত থেকে উপকূলের মানুষকে রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদ চরম দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়বে।
গাছ কাটার বিষয়ে বক্তব্য জানতে নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওনের কাছে গেলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে চাননি। উল্টো সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে গাছ কাটার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম। তিনি বলেন, সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছি। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার বলেন, বন উজাড়ের বিষয়টি বেশ কয়েকবার বন বিভাগকে সতর্ক করে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এমএম/এমআর