বিলের শাপলা যেন কৃষকের বর্ষাকালীন ব্যাংক

হোম » ফিচার » বিলের শাপলা যেন কৃষকের বর্ষাকালীন ব্যাংক
বৃহস্পতিবার ● ১৩ আগস্ট ২০২৬


 

বিলের শাপলা যেন কৃষকের বর্ষাকালীন ব্যাংক

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)

 

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। বিলের পানিতে নৌকা নিয়ে নেমে পড়েছেন কয়েকজন। কারও হাতে বাঁশের বৈঠা, কারও হাতে শাপলা সংগ্রহের ঝুড়ি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে ঘুরে তাঁরা তুলে নিচ্ছেন ফুটন্ত শাপলা। পরে সেই শাপলা নিয়ে ছুটছেন স্থানীয় পাইকারদের কাছে। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা বিলই এখন তাঁদের কর্মক্ষেত্র, আর শাপলা হয়ে উঠেছে সংসার চালানোর অন্যতম অবলম্বন।

 

জাতীয় ফুল শাপলা বরিশালের আগৈলঝাড়ায় শুধু বর্ষার সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং কয়েক শ পরিবারের জন্য মৌসুমি আয়ের উৎস। বর্ষায় কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় মাঠের কাজ কমে যায়। সেই কর্মহীন সময়ে বিনা পুঁজিতে বিল, খাল ও জলাবদ্ধ কৃষিজমি থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

 

আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়া, চৌদ্দমেদা, বারপাইকা, আস্করের বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ কৃষিজমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ব্যস্ততা। উপজেলার রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রত্নপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষ বর্ষাকালের এই মৌসুমি পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

 

বিলেই কর্মসংস্থান

 

চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলের শাপলা সংগ্রহকারী মো. শাহ আলম বলেন, বর্ষায় কৃষিজমি পানির নিচে থাকে। তখন কৃষিকাজ তেমন থাকে না। তাই ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে যাই। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ মুঠো পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারি।

 

সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে পাইকাররা মুঠোপ্রতি প্রায় ৫ টাকা দরে শাপলা কিনে নেন। পরে ভ্যানযোগে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও আশপাশের গৌরনদী ও উজিরপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেগুলো বিক্রি করেন। কেউ কেউ সরাসরি বাজারে বসেও শাপলা বিক্রি করেন।

 

পাইকার অসীম মন্ডল বলেন, সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এক মুঠো শাপলা ৫ টাকা দরে কিনি। পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ টাকা করে বিক্রি করি। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মুঠো বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে ভালোই আয় থাকে।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমে একজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মুঠো শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন। ভালো দিনে কারও কারও আয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রির সঙ্গে যুক্তদের দৈনিক বিক্রি দাঁড়ায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি।

 

চার মাসের ভরসা শাপলা

 

শাপলা সংগ্রহকারী মজিবুর রহমান বলেন, বছরের প্রায় চার মাস তিনি এই কাজ করেন। জমিতে কাজ না থাকায় এ সময় শাপলা তুলে বিক্রি করেন। শাপলা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ চালান তিনি।

 

মজিবুর রহমান বলেন, ‘কোনো পুঁজি লাগে না, তাই বর্ষায় শাপলা আমাদের জন্য বড় ভরসা।’

 

স্থানীয়ভাবে শাপলা মূলত সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শাপলার ডাঁটা দিয়ে তৈরি তরকারি গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিনের পরিচিত খাবার। তবে সময়ের সঙ্গে শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা বাড়ছে। ফলে বর্ষায় বিল, ডোবা ও জলাশয় থেকে বিনা খরচে পাওয়া শাপলা এখন অনেকের কাছে অর্থকরী পণ্যে পরিণত হয়েছে।

 

প্রকৃতির দান, বিনিয়োগ ছাড়াই আয়

 

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আষাঢ় থেকে ভাদ্র- এই তিন থেকে চার মাস শাপলার মৌসুম। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা ধান, পাট ও ধঞ্চের জমির পাশাপাশি খাল-বিল, পুকুর ও ডোবাতেও শাপলার বিস্তার ঘটে। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়ায় শাপলা উৎপাদনে কৃষকের আলাদা কোনো বিনিয়োগ করতে হয় না।

 

আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি মূলত প্রাকৃতিকভাবে কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে জন্মে। ফলে এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়। শাপলা যাতে কিছুটা বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়।


পানিই যখন আয়ের পথ

 

আগৈলঝাড়ার বিলাঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষা একসময় ছিল অনেকটা কর্মহীনতার মৌসুম। পানিতে তলিয়ে যেত কৃষিজমি, কমে যেত মাঠের কাজ। সেই পানিই এখন অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস। শাপলা সংগ্রহ, পাইকারি কেনাবেচা ও ভ্যানযোগে বিক্রিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক বলয়।

 

একদিকে বিল থেকে শাপলা তুলে আয় করছেন সংগ্রহকারীরা, অন্যদিকে পাইকার ও ভ্যানচালকরাও যুক্ত হচ্ছেন এর বিপণনে। ফলে একটি প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে কয়েক স্তরের কর্মসংস্থান।

 

বর্ষার পানিতে ফুটে থাকা শাপলা তাই আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। বছরের কয়েকটি মাসে এই শাপলাই হয়ে উঠছে বহু পরিবারের সংসার চালানোর নীরব অবলম্বন- প্রকৃতির দেওয়া এমন এক ‘ব্যাংক’, যেখানে বিনিয়োগ নেই, অথচ বর্ষায় মেলে জীবিকার নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৩৫:৪৬ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ