
মো. বেল্লাল হাওলাদার
আমি সাংবাদিক- অস্ত্র ছাড়া প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করি।
ঘুমালেও দু’চোখ থাকে নিয়ত সশস্ত্র পাহারায়।
শহরের কোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা
অথবা কোনো শব্দে আমার কলম শব্দের বৃষ্টি ঝরায়।
যখন দিনের ক্লান্তিতে রাতেরা ঘুমিয়ে পড়ে আড়ম্বরে,
তখনও ছুটে চলি কলমের শত বুলির উচ্চারণে।
আগুনের কুণ্ডলী, অস্ত্রের ঝনঝনানি-চিত্র আঁকি;
মানুষের কান্নায় কথা বলে ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশ।
কাঁধে দায়িত্ব, হাতে কলম- কখনো-বা ক্যামেরা,
এসবই যেন আমার যুদ্ধাস্ত্র!
টিয়ার শেলের ধোঁয়া, বুলেটের শব্দে কী-বা এসে যায়!
হয়তো মানুষ নিরাপত্তার ছাউনি খোঁজে বাঁচার তাগিদে,
তখনও আমার কলম, ক্যামেরা কথা বলে সত্যের অনুসন্ধানে।
খোঁজে রক্তাক্ত শরীর, ভাঙা ঘর কিংবা আতঙ্কিত মুখ-
এক অকুতোভয় ডাকহরকরার মতো
আঁকতেই হবে সবকিছু অবিকল।
অবশেষে ব্যবচ্ছেদ করা ছবিগুলোর ভেতরে আটকে থাকা
মানুষের আর্তনাদ কালো কালিতে,
সাদা বিবেকের অনুসন্ধানী শব্দমালায়
পত্রিকার পাতায় একটি খবর হয়ে
পৌঁছে যাবে আমজনতার ড্রয়িংরুমে।
অনিয়ম দেখি, অন্যায় দেখি, দুর্নীতির চিহ্ন আঁকি নির্নিমেষ।
যখন দেখি, বুঝি- অথচ লিখতে মানা,
তখন কলম অস্ত্র নয়, বরং ভোঁতা, বিকলাঙ্গ এক কাঠি যেন!
তাই তো লিখি। সংশোধন করি।
সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত খবর ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে,
সংবাদপত্রের বুক চিরে।
সেই লেখা খুলে দেয় কারও মুখোশ,
করে না কোনো আপস।
লাগুক না আঘাত কারও স্বার্থে, আসুক ফোন,
হুমকি, অপবাদ অথবা প্রাণনাশের উত্তপ্ত সংলাপ;
আসুক না মিথ্যা মামলার ভয়-
তবু হতে দেব না কালি-কলমের অপব্যবহার,
সত্যের অপমান।
কলম কি শুধু এক হাতের অস্ত্র?
একবার মানুষের মাঝে কোনো কথা রটে গেলে
সে রটনা কি সহজে থামানো যায়?
কেউ হয়তো বলতে পারেন,
এ তো শুধুই এক পেশা।
আমি বলি, শুধু কি পেশা?
বরং বড় এক আমানত, বন্ধু!
কারণ প্রতিটি সংবাদ লেখার আগে
নিজের বিবেকের কাছে দাঁড়াতে হয় নির্ভয়ে-
যা লিখছি, তা কি সত্যিই মানুষের জানার মতো সত্য?
তা কি বিশ্বাসযোগ্য?
ঘরে আমার সন্তান অপেক্ষা করে,
মা-জননীও নীরবে, নিভৃতে দোয়া করেন।
প্রিয় মানুষটি হয়তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে-
আজও কি মানুষটি নিরাপদে ফিরে আসবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি আমার কাছে সব সময় থাকে?
তবুও প্রতি ভোরে বেরিয়ে যাই।
বেরোতে হয় আমাকে-
কারণ আমার অনুপস্থিতিতে সংবাদ কি আর থেমে থাকে?
ঘটনা, রটনা অথবা মানুষের কান্না-
কখনো থেমে থাকে না।
আমি একজন সাংবাদিক।
শুধু খবর লিখি না, কিছু মুহূর্তও ধরে রাখি।
যে মুহূর্ত হয়তো আজ কেউ দেখতে চায় না,
হয়তো কাল সেটিই হয়ে উঠবে
একটি সময়ের দলিল।
আমার পরিচয় কোনো পদে নয়,
কোনো পুরস্কারের মঞ্চেও নয়।
আমি যে দৃশ্য দেখি, যে মানুষের কান্না শুনি,
তার কাছে আমার কলম এক মহাঋণে আবদ্ধ হয়ে যায়।
সেই ঋণ শোধ করতে এগিয়ে চলে
সময় এবং বিবেক।
হয়তো আমার নাম কেউ মনে রাখবে না,
হয়তো আমার লেখা হারিয়ে যাবে
অসংখ্য খবরের ভিড়ে।
তবুও এটাই আমার চাওয়া-
যে সময়টুকু দেখেছি,
তা যেন আমার সততার কালি-কলমে
স্বরূপে টিকে থাকে।
আমি সাংবাদিক।
আমার যুদ্ধ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।
আমার যুদ্ধ সেই নীরবতার বিরুদ্ধে,
যেখানে সত্য মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে,
মিথ্যার আড়ালে নাকানিচুবানি খায়!
যতদিন এ হাতে কলম থাকবে,
ততদিন চেষ্টা থাকবে-
ঘটনার ভেতর থেকে মানুষটাকে খুঁজে বের করতে,
আর মানুষের ভেতর থেকে
সত্যটাকে।