বয়স বাড়িয়ে বাল্যবিয়ে কলাপাড়ায় মাধ্যমিক শেষ করার আগেই বিয়ে ৩৩ শতাংশ ছাত্রীর

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » বয়স বাড়িয়ে বাল্যবিয়ে কলাপাড়ায় মাধ্যমিক শেষ করার আগেই বিয়ে ৩৩ শতাংশ ছাত্রীর
বৃহস্পতিবার ● ২৩ জুলাই ২০২৬


 

সংগৃহীত ছবি

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক কিশোরী। ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ১৬৬ জন ছাত্রীর মধ্যে এ বছর দশম শ্রেণিতে পড়ছে ৭৭৭ জন। চার বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩৮৯ জন। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, ঝরে পড়া ছাত্রীদের বড় একটি অংশের বিয়ে হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই প্রায় ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়েছে।

 

এদিকে বাল্যবিয়ে দিতে জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের মেলাপাড়া গ্রামে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই কিশোরীর প্রকৃত জন্মতারিখ ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর। সে অনুযায়ী তাঁর বয়স ১৪ বছর আট মাস। জন্মনিবন্ধনটি করা হয় ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নাম, বাবা-মায়ের নাম ও জন্মনিবন্ধন নম্বর অপরিবর্তিত রেখে জন্মসাল ২০১১-এর পরিবর্তে ২০০৭ দেখানো হয়। এতে কাগজপত্রে তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১৮ বছর আট মাস। এরপরই তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়।

 

স্থানীয়রা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করলে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতারকে একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেটি যাচাই-বাছাই না করেই বিষয়টি আর এগোয়নি।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোরীর বাবা রহিম আকন স্থানীয় এক চৌকিদারের সহায়তায় জেনেশুনে বাল্যবিয়েটি সম্পন্ন করেন। জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি তৈরি করতে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে চৌকিদার তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

 

কলাপাড়ায় এভাবে কাগজপত্রে বয়স বাড়িয়ে বাল্যবিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কোথাও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়ে বন্ধ হচ্ছে, আবার কোথাও আয়োজকদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে ঠেকানোর উদ্যোগ কার্যকর ফল দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

আইন অনুযায়ী, জন্মতারিখ পরিবর্তনের জন্য জাল কাগজপত্র তৈরি বা সরকারি রেকর্ডে প্রতারণামূলক পরিবর্তন আনা হলে জালিয়াতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি রেকর্ড জাল করার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত অভিভাবক, আয়োজক ও সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

 

কলাপাড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছি। বাল্যবিয়ে বন্ধে আমাদের পক্ষ থেকে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

 

তিনি জানান, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত কলাপাড়া উপজেলায় ২৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে।

 

তবে বিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্য বলছে, বাল্যবিয়ের কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ১৬৬ জন ছাত্রীর মধ্যে ২০২৫ সালে নবম শ্রেণিতে ওঠে ৯০০ জন। এ বছর দশম শ্রেণিতে পড়ছে ৭৭৭ জন।

 

উত্তর-পূর্ব পাটুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছাত্রী ছিল ৩৫ জন। এ বছর দশম শ্রেণিতে পড়ছে ১৭ জন। অর্থাৎ চার বছরে কমেছে ১৮ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫১ শতাংশ।

 

ধুলাসার ইউনিয়নের চরচাপলী ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছাত্রী ছিল ৫৮ জন। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে পড়ছে ৩৫ জন। কমেছে ২৩ জন।

 

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আলী আহম্মেদ বলেন, ‘ঝরে পড়া ছাত্রীদের প্রায় ৯৫ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে তাদের লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে।’

 

তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই অনেক কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যাচ্ছে।’

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি মাদ্রাসাগুলোতেও বাল্যবিয়ের প্রবণতা উদ্বেগজনক। ফলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শুধু বিয়ে বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও চলমান রয়েছে। জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কেউ বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

বাংলাদেশ সময়: ১৬:০৬:১১ ● ১৩ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ