কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতে যাতায়াত সহজ করবে গার্ডার ব্রিজ, কমবে ৪০ বছরের ভোগান্তি

হোম » পটুয়াখালী » কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতে যাতায়াত সহজ করবে গার্ডার ব্রিজ, কমবে ৪০ বছরের ভোগান্তি
রবিবার ● ১ নভেম্বর ২০২৬


কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতে যাতায়াত সহজ করবে গার্ডার ব্রিজ, কমবে ৪০ বছরের ভোগান্তিমেজবাহউদ্দিন মাননু

 

কুয়াকাটা সৈকতের সূর্যোদয় পয়েন্ট গঙ্গামতিতে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে নির্মাণ করা হয়েছে ৩০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার ব্রিজ। ব্রিজটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। আগামী ডিসেম্বর মাসে এটি চালু হলে পর্যটকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী তিন শতাধিক জেলে পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের সময় তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর পথ সুগম হবে।

 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বেড়িবাঁধের সড়ক দিয়ে গার্ডার ব্রিজ পার হয়ে সরাসরি গঙ্গামতি সৈকতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ব্রিজটির সংযোগ সড়কের দুই পাশে পর্যটকদের গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য ৫৫ মিটার এলাকাজুড়ে নান্দনিক পার্কিং জোন তৈরির কাজ চলছে। সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হলে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।

 

বর্তমানে কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতি সূর্যোদয় পয়েন্টে যেতে পর্যটকদের সৈকত ধরে চলাচল করতে হয়। ভাটার সময় হেঁটে যাওয়া সম্ভব হলেও জোয়ারের সময় পানিতে প্লাবিত হওয়ায় চলাচলের সুযোগ থাকে না। ওয়াকিং জোন না থাকায় তখন পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ব্রিজটি চালু হলে সব সময় গঙ্গামতি সূর্যোদয় পয়েন্টে যাওয়া যাবে।

 

রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের নিচে গঙ্গামতির খালে গোসল করছেন বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী মোশাররফ বিশ্বাস। তিনি জানান, খালের দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন। খালটিতে এখনো তিন থেকে চার ফুট পানি থাকে। তাঁরা এ পানি গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। স্থানীয়ভাবে খালটি গঙ্গামতির খাল নামে পরিচিত। খালটির সঙ্গে গঙ্গামতির লেকের সংযোগ রয়েছে। তবে অনেকে খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন বলেও জানান তিনি।

 

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের স্মৃতি তুলে ধরে মোশাররফ বিশ্বাস বলেন, ‘সিডরের সময় পানির চাপ সইতে না পেরে আমার ভাইয়ের ছেলে দুই বছরের কালাচান বাবা-মায়ের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মারা গেছে। খালটিতে তখন স্রোতের প্রচণ্ড চাপ ছিল। সাঁতরে সবাই বেড়িবাঁধের ভেতরে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিলেন। তখন এই ব্রিজটি থাকলে এমন মৃত্যু হতো না।’

 

মোশাররফ বিশ্বাসের ভাষ্যমতে, বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৬০০ ভোটার রয়েছেন। অন্তত তিন শতাধিক জেলে পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষের চলাচল সহজ হবে ব্রিজটি চালু হলে।

 

ব্রিজের নিচের খালের পানিতে গোসল করছিল সাত বছরের শিশু রবিউল। সে জানায়, ব্রিজটি চালু হলে তার স্কুলে যেতে আর সমস্যা হবে না। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিউল জানায়, বর্ষার কয়েক মাস তাদের অনেক সমস্যার মধ্যে থাকতে হয়। খালে পানি থাকায় স্কুলে যাতায়াত করতে পারে না।

 

স্থানীয় বাসিন্দা মুসা বিশ্বাস জানান, ব্রিজটি চালু হলে তাঁদের প্রায় ৪০ বছরের দুর্ভোগের অবসান হবে। একই কথা জানান মো. মহসিন ও মো. দেলোয়ার হোসেন। মিজানুর রহমান বলেন, একটি মহল ব্রিজটি নির্মাণের বিরোধিতা করে প্রচার করেছে, সেখানে কোনো খাল নেই, সংযোগ সড়ক নেই। কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রিজ কেন নির্মাণ করা হয়েছে, এমন প্রশ্ন তুলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

 

বর্তমানে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে লেম্বুরবন পর্যন্ত সৈকত ধরে চলাচলে তেমন সমস্যা হয় না। তবে গঙ্গামতি যেতে জিরো পয়েন্ট থেকে সৈকত ধরে যেতে হয়। নতুন ব্রিজটি চালু হলে ৩৩ কানি-সংলগ্ন এলাকা থেকে সরাসরি সৈকতে পৌঁছানো যাবে। এতে পর্যটকদের চলাচলের বিকল্প পথ তৈরি হবে এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে যাতায়াত আরও সহজ হবে।

 

ব্রিজটির গুরুত্ব শুধু পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়। বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী জেলে পরিবারগুলোর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্ষা মৌসুমে তুলাতলি খালে পাঁচ থেকে আট ফুট পানি থাকে। তখন খাল পার হয়ে বেড়িবাঁধের ভেতরে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রিজটি চালু হলে এ সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগের সময় বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দারা দ্রুত বাঁধের ভেতরে অবস্থিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন।

 

তিন কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট ঠিকাদার মো. মহিউদ্দীন আহমেদকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এরপর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের পর কাজ বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিজটির অপর পাশে পুরোনো প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার সড়কের উন্নয়নকাজও শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

 

কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখেই কুয়াকাটার উন্নয়নে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটকরা দ্রুত এক স্পট থেকে অন্য স্পটে যেতে পারবেন। পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরের জনগোষ্ঠীও দ্রুত বাঁধের ভেতরে যাতায়াত করতে পারবেন। বর্ষা মৌসুমে খালটি পাঁচ থেকে আট ফুট পানিতে ডুবে থাকে।’

 

ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি তিন শতাধিক জেলে পরিবারের দৈনন্দিন যোগাযোগ, দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে পর্যটকদের যাতায়াতে সুবিধা সৃষ্টি হবে। তবে পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য রক্ষা এবং খাল দখল রোধে খালটি খননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ সময়: ১৯:১৫:২৪ ● ১৮ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ