কাজ শেষের আগেই ফাটছে জিওব্যাগ, বৃষ্টিতে ধসছে মনপুরার বাঁধ

হোম » লিড নিউজ » কাজ শেষের আগেই ফাটছে জিওব্যাগ, বৃষ্টিতে ধসছে মনপুরার বাঁধ
বৃহস্পতিবার ● ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

ব্যবহৃত জিওব্যাগ বিভিন্ন স্থানে ফেটে গেছে, ইনসেটে ফেটে যাওয়া জিওব্যাগ।

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, মনপুরা (ভোলা)

 

ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ নিয়ে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ রক্ষায় ব্যবহৃত জিওব্যাগ ছিঁড়ে যাওয়া, সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ হাতের সামান্য চাপে ঝরে পড়া এবং বৃষ্টিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ধসে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

 

তাদের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি ব্যবহার না করে নদীর বালু দেওয়া হয়েছে। বাঁধের ওপর ও দুই পাশে নির্ধারিত পুরুত্বে মাটি দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তা করা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

মনপুরায় ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরায় উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় এক হাজার ১১৭ কোটি টাকা।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ২০২৫ সালের মার্চে দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা মো. রাসেদ নিহত হন। তার স্বজনদের অভিযোগ, ঠিকাদারের লোকজন তাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখায় ২০২৫ সালের ৩১ মে বাঁধের বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে ওমর নামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পরও বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম বন্ধ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।

 

বাঁধের কাজের অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয়রা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে একাধিকবার মানববন্ধনও করেছেন বলে জানা গেছে।

 

প্রকল্পে যা হওয়ার কথা

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। এর আওতায় মনপুরা উপজেলায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১৬৮টি স্পার নির্মাণ, ২৯ লাখ ৭৮ হাজার জিওটিউব ডাম্পিং ও জিওব্যাগ স্থাপন, ১১টি স্লুইসগেট এবং তিনটি হারবার পয়েন্ট নির্মাণের কথা রয়েছে।

 

প্রকল্পের কাজ ১৪টি প্যাকেজে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে মেসার্স লিয়াকত অ্যান্ড সন্স লিমিটেড ১৮ দশমিক ২ কিলোমিটার, গোলাম রাব্বানি কনস্ট্রাকশন ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড ৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার, প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড শূন্য দশমিক ৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে।

 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

 

প্রকল্পের ব্যয় কমাতে বাঁধের বাইরের অংশে ব্লকের পরিবর্তে সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ ভর্তি জিওব্যাগ ব্যবহারের নকশা করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পরীক্ষামূলকভাবে এ পদ্ধতিতেই কাজ শুরু করা হয়।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে প্রকল্পের কাজ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে সরেজমিনে প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় নামমাত্র মাটি ফেলে রাখার চিত্র দেখা গেছে।

 

হাতের চাপে ঝরে পড়ছে মিশ্রণ

 

সোনারচর, তালতলাসহ নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর পাশে ব্লকের পরিবর্তে সারি সারি জিওব্যাগ বসানো হয়েছে। এসব জিওব্যাগের কোনোটি ফেটে গেছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় সেলাই খুলে গেছে। কিছু জিওব্যাগের ভেতরের সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ সামান্য চাপেই ঝরে পড়ছে।

 

স্থানীয়দের দাবি, জিওব্যাগের ভেতরের বালু ও সিমেন্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে মিশে জমাট বাঁধার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তা হয়নি। ফলে জোয়ারের পানিতে এসব বালু সরে গিয়ে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

 

এ ছাড়া বাঁধের ওপর ও দুই পাশে এক মিটার পুরু করে মাটি দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে বৃষ্টির পানিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে।

 

দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের তালতলা স্লুইসগেট এলাকায় নতুন বাঁধ নির্মাণের কাজ গত জুনে শেষ হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষায় ওই বাঁধের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু ধসে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বাঁধের বালু পাশের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ছে।

 

তালতলা ছাড়াও সাকুচিয়ার মাঝেরঘাট, হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনারচর, চরফৈজুদ্দিনসহ অর্ধশতাধিক স্থানে বাঁধ ধসে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভেকু দিয়ে এসব স্থান পুনরায় মেরামত করেছে।

 

‘এক বস্তা সিমেন্টে তিন-চারটি জিওব্যাগ’

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি জিওব্যাগে দেড় বস্তা সিমেন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও এক বস্তা সিমেন্ট ভাগ করে তিন থেকে চারটি জিওব্যাগে দেওয়া হয়েছে। ফলে জিওব্যাগের ভেতরের বালু যথাযথভাবে জমাট বাঁধেনি। এ ছাড়া নির্ধারিত পুরুত্বের জিওব্যাগও ব্যবহার করা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

 

দক্ষিণ সাকুচিয়ার তালতলা এলাকার বাসিন্দা মো. মোশারেফ, সোলেমান, ফারুক ও সজিব বলেন, ‘বাঁধের বাইরে সিমেন্ট ও বালু মিশিয়ে জিওব্যাগ দেওয়ার কথা। কিন্তু জিওব্যাগে নামমাত্র সিমেন্ট দেওয়ায় তা জমাট বাঁধেনি। সামান্য চাপেই বালু ঝরে পড়ছে।’

 

তাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব অনিয়ম হয়েছে।

 

হাজিরহাট ইউনিয়নের রুবু উদ্দিন, হাশেম ও বনি আমিন বলেন, বাঁধে যে পরিমাণ মাটি দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। ফলে ভেতর থেকে বালু সরে বাঁধ ধসে যাচ্ছে। নদীভাঙন ঠেকাতে যে পরিমাণ জিওব্যাগ ডাম্পিং করার কথা, অনেক জায়গায় তাও করা হচ্ছে না।

 

তাদের আরও অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কারণে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

চার-পাঁচ কিলোমিটার বাঁধ কেটে রাখায় ভোগান্তি

 

দক্ষিণ সাকুচিয়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝেরঘাট মাছঘাট থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হালট পর্যন্ত প্রায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার বাঁধ কেটে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাজারের ব্যবসায়ীরাও মালামাল পরিবহন করতে পারছেন না। দ্রুত বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

যা বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

 

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহম্মদ খান বলেন, ‘বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ঠিকাদার এখনো আমাদের কাছে হস্তান্তর করেনি। বৃষ্টির পানিতে বাঁধের যেসব অংশ ধসে যাচ্ছে, ঠিকাদার সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করে দিচ্ছে। বাঁধের ওপরের সড়ক নির্মাণ হয়ে গেলে এ সমস্যা থাকবে না।’

 

সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রিত জিওব্যাগ এবং কাজের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিতভাবে বাঁধের কাজ তদারকি করছি। জিওব্যাগে সিমেন্ট ও বালু জমাট না বাঁধার তথ্য এখনো আমাদের কাছে আসেনি। এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেলে ঠিকাদারের মাধ্যমে সেগুলো পরিবর্তন করে দেওয়া হবে।’

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘মনপুরার বাঁধ নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে বা সেন্টসিমেন্টের জিওব্যাগ ছুটে গিয়ে থাকলে তা তদারকি করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে পুনরায় করা হবে।’

 

তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ গড়ে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাংলাদেশ সময়: ১৩:০২:২৮ ● ২৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ