সাগরে নিখোঁজ জেলেরা কি রাষ্ট্রের বিবেচনার বাইরে?

হোম » সম্পাদকীয় » সাগরে নিখোঁজ জেলেরা কি রাষ্ট্রের বিবেচনার বাইরে?
শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬


প্রতীকী ছবি

 

 

সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে একজন জেলে নিখোঁজ হলেন। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও ফিরলেন না তিনি। একসময় স্বজনেরা ধরে নিলেন, হয়তো আর কোনো দিনই ফিরবেন না তাঁদের প্রিয় মানুষটি। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতির বাস্তবতা মেনে নিলেও রাষ্ট্রীয় নথিতে তাঁর কোনো পরিচয় নেই। নেই নিখোঁজের স্বীকৃতি, নেই মৃত্যুর আইনি নিষ্পত্তি। ফলে স্বজনদের শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পত্তির অধিকার, ওয়ারিশানা এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন হচ্ছে, সাগরে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই?

 

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-মহিপুর উপকূলের নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক গভীর দুর্বলতা সামনে এনেছে। মহিপুরের নিজামপুর গ্রামের জেলে রিয়াজ হাওলাদার ২০১৬ সালে গভীর সমুদ্রে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হন। স্ত্রী, মা ও তিন সন্তানকে রেখে যাওয়া রিয়াজের পরিবার এক দশক পেরিয়েও তাঁর নিখোঁজ কিংবা মৃত্যুর কোনো সনদ পায়নি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও সমাধান মেলেনি। সরকারি সহায়তাও জোটেনি। একজন উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে পরিবারটি এখন অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আইনি জটিলতায় বিপর্যস্ত।

 

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উপকূলের বহু জেলে বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের অনেকের পরিবারের কাছে নেই কোনো সরকারি প্রত্যয়নপত্র। ফলে সম্পত্তির ওয়ারিশানা ও বণ্টন আটকে যাচ্ছে, প্রয়োজনের সময় সম্পত্তি বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছে না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের ভরণপোষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। অথচ গত এক থেকে দুই দশকে সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়া জেলেদের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন কিংবা পরিসংখ্যান অফিসে। মহিপুর ও আলীপুরের জেলে সংগঠনগুলোর কাছেও নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা। অর্থাৎ কতজন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন, কতটি পরিবার তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে, কত পরিবার আইনি স্বীকৃতি ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত, রাষ্ট্রের কাছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই।

 

এই বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক, কারণ জেলেরা শুধু একটি পেশার মানুষ নন; তাঁরা দেশের মৎস্যসম্পদ আহরণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রে যাওয়া এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর তাঁদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁদের পরিবারকে যখন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হয়, তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থার মানবিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

 

আমরা বুঝি, লাশ উদ্ধার না হলে প্রচলিত নিয়মে মৃত্যুসনদ দেওয়া যায় না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্যেও সেই আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। কিন্তু মৃত্যুসনদ দেওয়ার এখতিয়ার না থাকলেই কি প্রশাসনের আর কোনো দায়িত্ব নেই? একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের জন্য বিকল্প কোনো স্বীকৃতি, সহায়তা কিংবা আইনি প্রক্রিয়া থাকবে না কেন? আইনের সীমাবদ্ধতা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে স্থায়ী বাধা হতে পারে না। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার আওতায় বিকল্প ব্যবস্থা চালু করতে হবে, প্রয়োজনে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

এ ক্ষেত্রে প্রথম ও জরুরি কাজ হলো নিখোঁজ জেলেদের একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি তালিকা তৈরি করা। এ কাজের দায়িত্ব উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসনকে নিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, ট্রলার মালিক সমিতি ও জেলে সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় গত ২০ বছরের নিখোঁজ জেলেদের তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পরিবারের আবেদন, ট্রলারডুবির ঘটনা, সহকর্মী জেলেদের সাক্ষ্য, থানার সাধারণ ডায়েরি, উদ্ধার অভিযান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করে তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। কোনো নথি না থাকলে সরেজমিন তদন্তের সুযোগ রাখতে হবে। প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নিখোঁজ হওয়ার সময় ও স্থান, ট্রলারের পরিচয় এবং পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।

 

এ কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখা যাবে না। প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে মহিপুর ও আলীপুরে তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এরপর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তালিকা যাচাই করে তা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারকে একটি সরকারি নিবন্ধন নম্বর ও প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে, যাতে তাঁদের বারবার একই তথ্য ও প্রমাণ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটতে না হয়।

 

দ্বিতীয়ত, নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের আইনি জটিলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নিখোঁজ সনদ বা প্রশাসনিক প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে কোন কোন সরকারি সেবা ও সহায়তা পাওয়া যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঘোষণাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শ ও মামলা পরিচালনায় সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রশাসনিক প্রত্যয়নপত্র ও আইনগত মৃত্যুঘোষণা এক বিষয় নয়। তাই একটি দিতে গিয়ে অন্যটির আইনি শর্ত উপেক্ষা করা যাবে না।

 

তৃতীয়ত, এসব পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। নিখোঁজ জেলের স্ত্রী, সন্তান ও নির্ভরশীল মা-বাবার আর্থিক অবস্থা যাচাই করে যোগ্য পরিবারগুলোকে বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, শিশুদের শিক্ষা সহায়তা কিংবা প্রযোজ্য অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি এককালীন জরুরি সহায়তার জন্য বিদ্যমান সরকারি তহবিল ও প্রযোজ্য কল্যাণ কর্মসূচি ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো জেলে বিমা বা সরকারি কল্যাণ তহবিলের আওতায় থাকলে তাঁর পরিবার যেন প্রাপ্য অর্থ পেতে হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সহায়তার ক্ষেত্রে শুধু মৃত্যুসনদকে একমাত্র শর্ত না রেখে যাচাই করা নিখোঁজের সরকারি নথি বিবেচনার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

 

চতুর্থত, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে যেন কোনো জেলের পরিচয় হারিয়ে না যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে প্রতিটি ট্রলারের মাঝি ও জেলেদের নাম, পরিচয়, মোবাইল নম্বর এবং যাত্রার তথ্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ট্রলার ফিরে এলে যাত্রী তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রলার ফিরে না এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করতে হবে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। এতে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা নির্ধারণ, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং পরবর্তী সময়ে পরিবারের সহায়তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

 

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নতুন কোনো জটিল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদ, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সমন্বয়েই কাজ শুরু করা সম্ভব। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর, কাজের সময়সীমা ও অগ্রগতি তদারকির ব্যবস্থা নির্দিষ্ট করতে হবে। শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও জবাবদিহি।

 

সাগরে নিখোঁজ হওয়া মানুষগুলো হয়তো আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন জেলের জীবনের ঝুঁকি শুধু তাঁর নিজের নয়, তাঁর পরিবারেরও। তাই দুর্ঘটনার পর সেই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থারও অপরিহার্য অংশ।

 

আমরা মনে করি, কুয়াকাটা-মহিপুর ও আলীপুর থেকেই নিখোঁজ জেলেদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশাসনিক স্বীকৃতি এবং পরিবারগুলোর আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার কার্যক্রম শুরু করা উচিত। পরে তা দেশের সব উপকূলীয় এলাকায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। সাগরে নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে আর পরিচয়হীনতা ও অধিকারহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে দেওয়া যায় না। তাঁদের স্বজন হারানোর বেদনা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু রাষ্ট্র চাইলে তাঁদের অনিশ্চিত জীবনকে নিরাপদ করতে পারে। এখন প্রয়োজন সেই সদিচ্ছার বাস্তব প্রয়োগ।

বাংলাদেশ সময়: ১৯:২৬:০৬ ● ৩০ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ