রাঙ্গাবালীতে নির্মাণে ঝুলে আছে হাসপাতাল, নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

হোম » লিড নিউজ » রাঙ্গাবালীতে নির্মাণে ঝুলে আছে হাসপাতাল, নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
বৃহস্পতিবার ● ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

রাঙ্গাবালীতে নির্মাণে ঝুলে আছে হাসপাতাল, নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পটুয়াখালী

তিনদিকে নদী, একদিকে সাগর। চারপাশের জলরাশির মধ্যে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী। প্রায় দুই লাখ মানুষের এই উপজেলায় আজও নেই একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর রোগীকে চিকিৎসার জন্য নিতে হয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা শহরে। আর সেই পথের বড় বাধা উত্তাল আগুনমুখা নদী।

রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে সময়ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু। নৌযানে করে নদী পাড়ি দিয়ে অন্যত্র পৌঁছাতে হয়। বৈরী আবহাওয়া বা নদী উত্তাল থাকলে সেই যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এভাবে চিকিৎসার জন্য নদী পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝনদীতেই অসুস্থ রোগীর মৃত্যু এবং গর্ভবতী নারীদের নানা জটিলতার ঘটনাও ঘটেছে।

এমন বাস্তবতায় রাঙ্গাবালীতে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর কিছুটা অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছেন দ্বীপ উপজেলার মানুষ।

সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যু

সাম্প্রতিক একটি ঘটনাও রাঙ্গাবালীর স্বাস্থ্যসেবার সংকটকে সামনে এনেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চরমোন্তাজ ইউনিয়নের হেলাল খন্দকার নামের এক যুবক ধানের রোয়া দেখতে গেলে সাপের কামড়ের শিকার হন। পরে তাকে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাটির পর স্থানীয়দের মধ্যে আবারও প্রশ্ন উঠেছে, রাঙ্গাবালীতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল থাকলে হেলাল খন্দকারকে আরও দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হতো কি না। তাদের অভিযোগ, জরুরি চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী উপজেলায় যেতে গিয়ে প্রতিনিয়তই সময়ের সঙ্গে লড়তে হয়।

সাধারণ চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র

রাঙ্গাবালী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটিতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ১২টি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্বর, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনোটিতেই এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। ফলে সাধারণ চিকিৎসার বাইরে জটিল বা জরুরি রোগীদের এসব কেন্দ্র থেকে অন্যত্র পাঠাতে হয়।

বিশেষ করে প্রসূতি, সাপে কাটা, দুর্ঘটনা কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও রাঙ্গাবালীর ভৌগোলিক অবস্থান সেই সুযোগকে সীমিত করে দিয়েছে। তিনদিকে নদী ও একদিকে সাগরবেষ্টিত হওয়ায় এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা মূলত নৌপথনির্ভর।

বন্ধ কাজ, নতুন করে দরপত্র

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, বরাদ্দ না পাওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। হাসপাতালের বাকি কাজ শেষ করতে এখন নতুন করে দরপত্র আহব্বান করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ দ্রুত শেষ করতে দরপত্র হয়েছে। খুব শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। রাঙ্গাবালীর হাসপাতালকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, এই উপজেলায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই।

চিকিৎসাসেবা কবে মিলবে?

একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ভবনও আংশিক তৈরি হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্য সেই ভবন এখনো মানুষের কাছে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। ৫০ শয্যার হাসপাতালের কাজ ৫৫ শতাংশ শেষ হওয়ার পরও বাকি কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন উপজেলার মানুষ।

রাঙ্গাবালীর বাসিন্দাদের জন্য তাই হাসপাতালটি শুধু একটি ভবন নয়, জরুরি চিকিৎসার আশ্রয়। আগুনমুখা নদী পেরিয়ে অন্য উপজেলায় যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে এবং সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে নির্মাণাধীন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দ্রুত চালু করার দাবি তাদের।

প্রশ্নটি তাই থেকেই যাচ্ছে- আর কত প্রাণহানি কিংবা দুর্ভোগের পর রাঙ্গাবালীর মানুষ নিজ উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পাবেন?

বাংলাদেশ সময়: ১২:০৪:৫৬ ● ২৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ