খুতবার সময় দানবাক্সে টাকা তোলা কি শরিয়তসম্মত?

হোম » ইসলামী জীবন » খুতবার সময় দানবাক্সে টাকা তোলা কি শরিয়তসম্মত?
শুক্রবার ● ৭ আগস্ট ২০২৬


প্রতীকি ছবিসাগরকন্যা ডেস্ক

 

শুক্রবার মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মসজিদে সমবেত হয়ে খুতবা শোনা এবং জুমার নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। জুমার খুতবা মুসলমানদের ইমান, আমল, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

 

বর্তমানে অনেক মসজিদে খুতবা চলাকালীন দানবাক্স বা ব্যাগ ঘুরিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, খুতবার সময় এভাবে টাকা সংগ্রহ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ? কোরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের আলোচনায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)

 

তাফসিরবিদদের মতে, এ আয়াতে ‘আল্লাহর স্মরণ’ বলতে জুমার খুতবা ও নামাজ-উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। তাই আজানের পর দুনিয়াবি কাজ পরিহার করে খুতবার প্রতি মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (তাফসিরুল ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ৩/১৪১৯)

 

কোনো নফল বা মুস্তাহাব আমল আদায় করতে গিয়ে যদি ওয়াজিব বা অধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

 

রাসুল (সা.) খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকা ও মনোযোগ ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, “চুপ থাকো”, তবে তুমিও অনর্থক কাজে লিপ্ত হলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)

 

অন্যকে চুপ থাকতে বলাও যেখানে অনুচিত, সেখানে খুতবার সময় পকেট থেকে টাকা বের করা, দানবাক্স বা ব্যাগ আদান-প্রদান করা কিংবা টাকা গোনার মতো কাজ যে মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।

 

আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন এমন অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করে যে ইমাম মিম্বরে অবস্থান করে খুতবা দিচ্ছেন, তখন ইমাম খুতবা শেষ না করা পর্যন্ত সে কোনো নামাজ আদায় করবে না এবং কোনো কথাও বলবে না।’ (ফাতহুল বারি, ২/৪০৯)

 

ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কোরআন ও হাদিসে দানশীলদের ব্যাপক উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে প্রতিটি ইবাদতেরই নির্ধারিত সময় ও আদব রয়েছে।

 

খুতবা শোনা মুসল্লির জন্য ওয়াজিব, আর দান সংগ্রহ নফল বা মুস্তাহাব কাজ। এ নীতির ভিত্তিতেই ফকিহরা খুতবার সময় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা খুতবা শোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে মুসল্লিদের মধ্যে দানবাক্স বা ব্যাগ ঘুরিয়ে অর্থ সংগ্রহ করাও একই কারণে খুতবার আদবের পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয়। (আল-বাহরুর রায়েক শরহু কানজিদ দাকায়েক, ২/২৫৯)

 

মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ নিঃসন্দেহে নেকির কাজ। তবে তা এমন সময় করা উচিত, যাতে খুতবার মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।

 

এ কথা মনে রাখা জরুরি, এখানে দানকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না; বরং আলোচনার বিষয় হলো দান সংগ্রহের সময় ও পদ্ধতি।

 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)

 

আরেক আয়াতে এসেছে, ‘তোমরা যে কল্যাণকর বস্তু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা অবশ্যই জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)

 

অতএব, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ অবশ্যই সওয়াবের কাজ। তবে তা এমন সময় করা উচিত, যাতে খুতবার মর্যাদা ও মুসল্লিদের মনোযোগ অক্ষুণ্ন থাকে। এ জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষের উচিত খুতবার আগে অথবা জুমার নামাজ শেষে দান সংগ্রহ করা।

 

এ ছাড়া মসজিদের প্রবেশপথে স্থায়ী দানবাক্স স্থাপন কিংবা জুমার আগে ঘোষণা দিয়ে দান সংগ্রহ করাও শরিয়তসম্মত ও কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এতে দানের সওয়াবও অর্জিত হবে, আবার খুতবার আদবও বজায় থাকবে।

 

লেখক: ফয়জুল্লাহ রিয়াদ, মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ, রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ।

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৬:৩১ ● ২৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ