
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বেতাগী (বরগুনা)
বরগুনায় বেতাগীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নেছার উদ্দিন খানের চাঁদা দাবির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ধারণ করা ভিডিওটি একদিন পর রবিবার রাতে ভাইরাল হয় বলে জানা গেছে।
ভিডিওতে কথোপকথনের পুরো অংশ স্পষ্ট না হলেও নেছার উদ্দিন খানকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন যা পারো তা দিয়ে দেও।’ এর জবাবে অপর প্রান্তের এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘টাকা নাই, টাকা নাই।’ তবে ভিডিওটি কোথায়, কার কাছ থেকে এবং কী পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় নতুন করে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগটি অস্বীকার করে তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে এর আগেও চাঁদাবাজি, অবৈধ টোল আদায়, হুমকি-ধমকি ও দলীয় পদ ব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে বেতাগী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধনও হয়। ওই মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়, ইজারাদারের নামে রশিদ ছাপিয়ে তিনি যানবাহন থেকে অবৈধভাবে টোল আদায় করছেন।
এরপর একই ঘটনায় নেছার উদ্দিন খানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। মামলার এজাহারে তাঁর বিরুদ্ধে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং পরদিন থেকে জাল রশিদ ব্যবহার করে যানবাহন থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়। মামলায় নেছার উদ্দিন খানকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল।
মামলার বাদী ছিলেন বেতাগী পৌর টেম্পুস্ট্যান্ডের ইজারাদার ও তৌহিদুল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলাদার। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মামলায় নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইন ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় অন্য আসামিদের একজনকে গ্রেপ্তারও করেছিল পুলিশ।
এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় পদ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন। ২০২৫ সালের মানববন্ধনে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যও দেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর নেছার উদ্দিন খান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদা দাবি এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো বিষয়ে পৃথকভাবে মামলা বা প্রশাসনিক নথির তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে নেছার উদ্দিন খানকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। নোটিশে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীর অভিযোগ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির নামে নেছার উদ্দিন খান অর্থ আদায় করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব দাবি করেন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, স্থানীয় কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকেও তিনি বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি করেছেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন।
বেতাগী পৌর টেম্পুস্ট্যান্ডের ইজারাদার মো. খোকন হাওলাদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করছি। ৫ আগস্টের পর নেছার উদ্দিন খান সেখানকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করছেন। তাঁর ভয়ে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকেন।’
বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতাও নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে দলীয় পদ ব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র শাহজাহান কবির বলেন, ‘দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অপকর্ম করলে তার দায়ভার দল নেবে না। দলে চাঁদাবাজদের কোনো জায়গা নেই। দলীয় পরিপন্থী কোনো কাজ করা হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে মো. নেছার উদ্দিন খান বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ হাওলাদার বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নেছার খানের চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগও করেনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তবে মৌখিকভাবে অভিযোগের কথা শুনেছি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের বিষয়টিও আমার নজরে আসেনি।’