সাগরকন্যা ডেস্ক
ইসলামে দৈনন্দিন জীবনের আদর্শ হলো-দিনের বেলায় কর্মে আত্মনিয়োগ করা এবং রাতকে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা। তবে কর্মব্যস্ত জীবনে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে।
ইসলামে এ ধরনের ছুটি বা অবকাশ কাটানো কোনো অন্যায় নয়। বরং সঠিক নিয়ত ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ছুটিকে কাজে লাগানো গেলে তা মানসিক প্রশান্তি, কর্মশক্তি পুনরুদ্ধার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি মাধ্যম হতে পারে।
ক্লান্তি দূর করা এবং জীবনকে উপভোগ করার জন্য ইসলামে বৈধ চিত্তবিনোদনের সুযোগ রয়েছে। সাহাবি হজরত হানজালা (রা.) একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, ‘হানজালা তো মোনাফেক হয়ে গেছে!’ কারণ তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকলে পরকালের যে অনুভূতি পেতেন, পরিবার-সংসারের কাজে ব্যস্ত হলে তা কমে যেত। তখন মহানবী (সা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘হানজালা, সব সময় একই অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়; জীবনে কাজের পাশাপাশি বিশ্রামেরও প্রয়োজন রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫০)
অন্য এক হাদিসে ঈদের দিন মসজিদের প্রাঙ্গণে খেলাধুলার অনুমতি দিয়ে মহানবী (সা.) বলেন, ‘ইহুদিরা জানুক, আমাদের ধর্মেও অবকাশ ও প্রশান্তির সুযোগ রয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৪৮৫৫)
আল্লামা ইবনে আশুর লিখেছেন, ক্লান্তি দূর করা ও মনকে সতেজ রাখার জন্য বিনোদন বৈধ, যদি তা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে তাকে কর্মবিমুখ না করে। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১২/৩৯)
ক্লান্তি দূর করা এবং মনকে সতেজ করার জন্য বিনোদন বৈধ, যদি না তা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে কর্মবিমুখ করে তোলে।
ছুটির সময়কে ফলপ্রসূ ও আনন্দদায়ক করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১. বিনোদন যেন পাপে পরিণত না হয়
অনেকে মনে করেন, ছুটি মানেই সব ধরনের নৈতিক বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত থাকা। অথচ ইসলামে বৈধ উপায়ে আনন্দ উপভোগের বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভাবর্ধক বস্তু ও উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?’ (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৩২)
তাই ভ্রমণ, সাঁতার বা প্রকৃতি উপভোগসহ বিভিন্ন বৈধ বিনোদনে কোনো বাধা নেই, যদি তা শরিয়তের সীমা অতিক্রম না করে।
২. নামাজে গাফিলতি না করা
ছুটি মানে ইবাদত থেকে ছুটি নয়। ভ্রমণ বা অবকাশ যাপনেও নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করতে হবে। ইসলামে যুদ্ধাবস্থাতেও নামাজ ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়নি। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৮-২৩৯)
কর্মব্যস্ততায় যাদের সময়মতো নামাজ পড়া কঠিন হয়ে যায়, ছুটি তাদের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উত্তম সুযোগ হতে পারে।
৩. পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণ
পরিকল্পনাহীন ছুটি অনেক সময় অপচয়ে পরিণত হয়। মহানবী (সা.) জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাই ছুটির জন্যও একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
যেমন-ভালো বই পড়া, বইয়ের পর্যালোচনা পড়া, আত্মউন্নয়নমূলক কোর্স করা অথবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সম্পর্ক দৃঢ় করা।
৪. প্রশান্তির উপযুক্ত মাধ্যম বেছে নেওয়া
সব মানুষের আনন্দের উৎস এক নয়। কেউ প্রকৃতির সান্নিধ্যে শান্তি পান, কেউ নদী বা সমুদ্রের কাছে, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ অনুভব করেন। তাই নিজের মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুস্থ বিনোদন নির্বাচন করা উচিত।
ছুটি জীবনের ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্দীপনায় কাজে ফেরার এক সুন্দর সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা ও নৈতিকতার ভারসাম্য থাকলে প্রতিটি মুহূর্তই মানসিক প্রশান্তি ও সওয়াবের মেলবন্ধনে পরিণত হতে পারে।
৫. ভালো সঙ্গী নির্বাচন
ছুটির আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করে সঙ্গীর ওপর। সৎ সঙ্গ মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে, আর অসৎ সঙ্গ আনন্দকে বিপথে নিতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। সে কিছু না দিলেও তার কাছ থেকে সুবাস পাওয়া যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)
৬. লক্ষ্য অনুযায়ী সময় নির্বাচন
ছুটির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময় নির্বাচন করা প্রয়োজন। যেমন, ওমরাহ পালনের জন্য রমজান বা জিলহজ মাস অধিক উপযোগী। আবার প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য আবহাওয়া বিবেচনায় সময় নির্বাচন করাই উত্তম।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) লিখেছেন, আল্লাহর পথে শক্তি অর্জনের নিয়তে আহার, নিদ্রা ও বিশ্রাম গ্রহণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। (মাদারিজুস সালিকিন, ২/২১৬)
৭. উপযুক্ত স্থান নির্বাচন
উদ্দেশ্য অনুযায়ী স্থান নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক প্রশান্তি চাইলে নিরিবিলি পরিবেশ, আর সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে চাইলে সাংস্কৃতিক বা জনবহুল স্থান বেছে নেওয়া যেতে পারে। কোরআনেও কিছু স্থানের বিশেষ মর্যাদার উল্লেখ রয়েছে, যা স্থানের গুরুত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। (সুরা আল-বালাদ, আয়াত: ১)
৮. আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়
ছুটি শেষে নিরাপদে ফিরে এসে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যেসব নেয়ামত রয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৩)
আরও বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)
ছুটি বা অবকাশ অলসতা কিংবা সময় নষ্ট করার উপলক্ষ নয়। বরং এটি জীবনের ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্যমে কর্মে ফেরার একটি মূল্যবান সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা, উত্তম নিয়ত, নৈতিকতার ভারসাম্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মানসিকতা থাকলে ছুটির প্রতিটি মুহূর্তই হতে পারে মানসিক প্রশান্তি ও সওয়াব অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম।