
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
কুয়াকাটা পর্যটন এলাকায় শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাস জমি অনিয়মের মাধ্যমে বন্দোবস্ত নিয়ে বিক্রির পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। এতে পর্যটন এলাকার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অকৃষি ও গুরুত্বপূর্ণ এসব সরকারি খাস জমি ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে কাগজপত্রে বন্দোবস্ত দেখিয়ে একটি মহল আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি দুস্থ ও ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অনিয়মের মাধ্যমে বন্দোবস্ত দেওয়া সরকারি খাস জমি উদ্ধারে সরকারপক্ষ থেকে বন্দোবস্ত বাতিলের লক্ষ্যে মামলা (নং-৭৩/১০) দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে বন্দোবস্ত বাতিল হলেও আইনি জটিলতায় জমিগুলো এখনও দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭৪-৭৫ সালে দেওয়া কিছু বন্দোবস্তের জমি ২০০৯ সালে রেজিস্ট্রি করা হয়, যা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বর্তমানে ওই জমির মালিকদের কাছ থেকে এক-তৃতীয়াংশ চুক্তিতে বিক্রির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছে একটি চক্র। এ ঘটনায় কুয়াকাটার কয়েকজন ভূমিদস্যু ও রাজনৈতিক নেতার নামও আলোচনায় এসেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কবুলিয়ত রেজিস্ট্রির আগেই অনেক জমির মিউটেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। যদিও প্রায় ৫০ বছর ধরে এসব জমিতে বহু পরিবার বসবাস করে আসছে। কুয়াকাটা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেনপাড়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাঞ্জুপাড়া এবং ৩ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহাসড়কসংলগ্ন এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কুয়াকাটা পৌর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেনপাড়ায় ১৯৭৪ সালের কেস নং-১৯২-কে’র মাধ্যমে একটি জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও তা ২০০৯ সালে রেজিস্ট্রি করা হয়। পরে সরকার বন্দোবস্তটি বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট চক্র নতুন করে ২২৯১ নম্বর এসএ খতিয়ান খুলে আপিল করেছে বলে জানা গেছে।
কুয়াকাটা মৌজার এসএ দাগ নম্বর ৫৮, ৫৩, ৬৪ ও ৬৮-এর প্রায় দেড় একর জমির মালিক হিসেবে হাকিম নামের এক ব্যক্তির নাম থাকলেও বাস্তবে সেখানে প্রায় ১৯টি পরিবার বসবাস করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব জমি উদ্ধার করে বিক্রির উদ্দেশ্যে হাকিমের সঙ্গে চুক্তিপত্র করেছে একটি চক্র।
ওই জমিতে বসবাসকারী ভূমিহীন শহিদ মিস্ত্রি সাগরকন্যাকে বলেন, এ জমিতে প্রায় ৬০-৭০ বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদার বসবাস। এখন একটি মহল জমি বিক্রির জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
অপর বাসিন্দা দুলাল বলেন, আমরা বহু বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এখানে আমাদের বসতবাড়ি ও গাছপালা রয়েছে।
এদিকে, লতাচাপলী মৌজার ১৩৪৬ খতিয়ানের প্রায় ৪ একর ৭৭ শতক খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের ঘটনাও সামনে এসেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বন্দোবস্ত কেস ও মিসকেস নম্বর তৈরি করে একটি চক্র ওই জমি নিজেদের নামে নিয়ে নেয়। এমনকি বন্দোবস্তের সময় একজন গ্রহীতার বয়স মাত্র ৮ বছর ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ২০১১ সালে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান হাওলাদার বলেন, কুয়াকাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। এখানে খাস জমি দখল হয়ে গেলে ভবিষ্যতে সরকারের বড় ক্ষতি হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে যারা জমি দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।