
মেজবাহউদ্দিন মাননু
লোকসান, পাইকার সংকট ও দাম পতনের কারণে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় তরমুজ চাষীদের কপাল পুড়েছে। বিক্রি না হওয়া তরমুজ মাঠ ও মোকামে পড়ে থাকায় সহস্রাধিক চাষী চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন; অনেকের রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে।
চরচান্দুপাড়া গ্রামের যুবক ফেরদৌস তালুকদার এ বছর ৬৪ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ আবাদ করেন। এতে এখন পর্যন্ত তার প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও বাজারে দাম ধসে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। ঈদের দুই দিন আগে বিক্রি শুরু করে এক চালানে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন, যেখানে একটি গাড়ির শ্রমিক ও পরিবহন খরচই প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পরবর্তী চার গাড়ি তরমুজ এখনো বিক্রি হয়নি; নতুন করে পাঠানো চার গাড়ির বিক্রিও অনিশ্চিত।
তিনি জানান, গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজে প্রায় ৯ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এবার ২ লাখ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ২২০০ টাকা মণ দরের তরমুজ বাধ্য হয়ে ১২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকার না আসা এবং মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্তত ১২ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
ফেরদৌস আরও জানান, ঈদের আগে ও পরে কয়েক দফা বৃষ্টিতে ক্ষেত কাদায় পরিণত হয়েছে, পাকা তরমুজে কাদা লেগে নষ্ট হচ্ছে। ফাল্গুন মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন ও চাহিদা- উভয়ই প্রভাবিত হয়েছে। রোজার শুরুতে কিছু চাহিদা থাকলেও এখন বাজার প্রায় স্থবির। অনেক বাইরের চাষী দেনার চাপে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলেও জানান তিনি।
একই অবস্থা উপজেলার চরচান্দুপাড়া গ্রামের রিয়াজ এবং ধানখালীর নমরহাট এলাকার চাষী অলিউল্লাহর। রিয়াজ ২৪ বিঘা এবং অলিউল্লাহ ৪০ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। অলিউল্লাহ সাগরকন্যাকে জানান, তিনজন শ্রমিক নিয়ে শুরু থেকে চাষাবাদ করেছেন। ফলন ভালো হলেও দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে পথে বসতে হবে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, যারা আগাম ফলন পেয়েছেন এবং রমজানের মধ্যে বিক্রি করতে পেরেছেন, তারাই কিছুটা লাভবান হয়েছেন। বাকি অধিকাংশ চাষী এখন লোকসানের চাপে দিশেহারা। কয়েকশ চাষীর ক্ষেতে আবার ফলনও আশানুরূপ হয়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কলাপাড়ায় ৪,৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, যেখানে প্রায় তিন হাজার চাষী যুক্ত রয়েছেন। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪০৪ কোটি টাকার উৎপাদন। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্ধেক চাষী লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান জানান, গত বছর ৩,৩৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়ে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৪০ টন ফলন পাওয়া গেছে। এ বছর আবাদি জমি বাড়লেও ফলন কিছুটা কম এবং আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে অর্ধেক চাষীর লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।