
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, সাতক্ষিরা
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দফায় দফায় পিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। প্রথম দফায় মারধরের পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে রাতে একদল লোক হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে আবারও মারধর করেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা শামীমকে মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে দুই থেকে আড়াই শ লোক হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে সাতক্ষীরায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অডিও কথোপকথনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত। স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, শামীমের কয়েকটি অডিও কথোপকথন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেসব কথোপকথনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে, এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে শামীমের পরিবারের সদস্যদের দাবি, কয়েক দিন ধরে তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, শামীম মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। কয়েক দিন আগে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শামীমের শাস্তির দাবিতে দেবহাটা উপজেলা সদরে একদল মানুষ মিছিল করছেন। মিছিল থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। পরে তাঁকে যে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, সেখানে যাওয়ার আহ্বান জানাতেও শোনা যায়।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর করছেন, এমন খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, তিনি ধর্ম অবমাননা করেছেন।
ওসি আরও বলেন, রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে দুই থেকে আড়াই শ লোক হাসপাতালে গিয়ে শামীমের চিকিৎসায় বাধা দেন। পুলিশ, আনসার সদস্য ও চিকিৎসকেরা তাঁদের বাধা দিলেও তাঁরা শোনেননি। একপর্যায়ে পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বুধবার সকালে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম দফায় মারধরের পর শামীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রাতে শতাধিক ব্যক্তি ওয়ার্ডের ভেতরে অন্য রোগীদের সামনেই তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবারও মারধর করা হয়। এতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় মারধরের কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে শামীমকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁকে ঘিরে অনেক মানুষ ভিড় করেন এবং কয়েকজনকে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে রাতে উপজেলা সদরে শাস্তির দাবিতে মিছিল করতে দেখা যায় একদল মানুষকে।
এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি এইচ এম শাহীন বলেন, অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।