গলাচিপায় কর বাড়লেও বাড়েনি নাগরিক সেবা, দুর্ভোগে পৌরবাসী

হোম » পটুয়াখালী » গলাচিপায় কর বাড়লেও বাড়েনি নাগরিক সেবা, দুর্ভোগে পৌরবাসী
বৃহস্পতিবার ● ৩০ জুলাই ২০২৬


গলাচিপায় কর বাড়লেও বাড়েনি নাগরিক সেবা, দুর্ভোগে পৌরবাসী

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, গলাচিপা (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌরসভায় পৌরকর ও বাজেটের আকার বাড়লেও নাগরিক সেবার মানে তেমন উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। প্রথম শ্রেণির (ক শ্রেণি) পৌরসভার মর্যাদা পাওয়ার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত সড়কবাতির কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ নয়টি ওয়ার্ড ও ৩ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গলাচিপা পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়। ২০১৩ সালে এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা পেলেও নাগরিক সেবায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪১ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৭ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ কোটি ২৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭২ টাকা এবং উদ্বৃত্ত রাখা হয়েছে ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৭৪১ টাকা। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৫৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৭০ কোটি ৬৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৪ টাকা। একই সময়ে পৌরকর ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে কর বৃদ্ধি সত্ত্বেও সড়ক, ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়কবাতির মতো মৌলিক সেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পৌরবাসী।

সূত্র জানায়, পৌর এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে প্রধান দুটি সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় ৩০ কিলোমিটার ড্রেনের বড় অংশ ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এখনো কোনো স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নেই। এসব সমস্যা সমাধানে একটি প্যাকেজ প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়কই বেহাল। কোথাও ইট-সুরকি উঠে বড় গর্ত, কোথাও কংক্রিট ভেঙে রড বেরিয়ে এসেছে। বৃষ্টি হলেই গর্তে পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে গলাচিপা সরকারি কলেজ-সদর রোড ও টিএন্ডটি সড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, রোগী ও বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ চলাচল করেন। এছাড়া বহু লিংক সড়ক বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে।

অপর্যাপ্ত সড়কবাতির কারণে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে আনন্দপাড়া, মুসলিমপাড়া, সাহাপাড়ার ধোপাবাড়ি, শান্তিবাগ ও রতনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। টানা বর্ষণে অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে।

পানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও রয়েছে অভিযোগ। পৌরসভার দুটি উচ্চ জলাধার থেকে পানি সরবরাহ করা হলেও অনেক সময় পানিতে শ্যাওলা, পোকা ও ময়লা পাওয়া যায় বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। বিদ্যুৎ চলে গেলে পানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।

পৌরবাসী পরেশ দাস বলেন, নামেই আমরা পৌরবাসী। রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলা হয়, দুর্গন্ধে চলাচল করা যায় না। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ধোপাবাড়ি এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়িতে পানি ওঠে। আমাদের এলাকায় সড়কবাতিও নেই।

বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়। বৃষ্টি বেশি হলে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরেই এই পৌরসভা অবহেলার শিকার।

ব্যবসায়ী আবুল বাসার বলেন, প্রতি বছর কর বাড়ছে, কিন্তু সেবা বাড়ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি আসে না। রাস্তা ও ড্রেনের সমস্যায় ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অটোরিকশাচালক সোহেল বলেন, রাস্তায় বড় বড় গর্ত থাকায় গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। রাতে সড়কবাতি না থাকায় চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

কলেজ শিক্ষার্থী জুয়েল বলেন, প্রতিদিন ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে কলেজে যেতে কষ্ট হয়। বর্ষাকালে কাদা ও জলাবদ্ধতায় পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। দ্রুত রাস্তা সংস্কার দরকার।

গলাচিপা পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু আউয়াল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির আওতায় প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৮০ হাজার ২ টাকা ব্যয়ে ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ-সংস্কার, পানি নিষ্কাশন উন্নয়ন, ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট ও সোলার লাইট স্থাপন, ব্রিজ নির্মাণ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ রয়েছে। অনুমোদন পেলেই টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।

গলাচিপা পৌর প্রশাসক আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, পৌর এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিক সেবা উন্নত করা হবে।

প্রায় ২৫ হাজার মানুষের এই পৌরসভায় এখনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। সম্প্রতি নদীতীরে একটি মিনি পার্ক নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।


এসডি/এমআর

বাংলাদেশ সময়: ১৭:০৫:৪২ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ