মানুষের কণ্ঠে কথা বলবে কম্পিউটার, এআইয়ের নতুন জাদুর দুনিয়া

হোম » প্রযুক্তি » মানুষের কণ্ঠে কথা বলবে কম্পিউটার, এআইয়ের নতুন জাদুর দুনিয়া
রবিবার ● ২৬ জুলাই ২০২৬


 

মানুষের কণ্ঠে কথা বলবে কম্পিউটার, এআইয়ের নতুন জাদুর দুনিয়া

নওশেদ আলম

ভাবুন তো, আপনি ঘরে বসে বিজ্ঞানের কোনো কঠিন তত্ত্ব বা সূত্র বোঝার চেষ্টা করছেন। বইয়ের পড়া কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ আপনার ল্যাপটপ থেকে ভেসে এল আইনস্টাইনের চেনা গম্ভীর কণ্ঠ। তিনি সহজ বাংলায়, এমনকি কৌতুক করে, আপনাকে কঠিন সূত্রটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

অথবা ভাবুন, প্রিয় কোনো কাল্পনিক চরিত্রের মতো কণ্ঠে আপনি শুনছেন মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের গল্প।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কল্যাণে এমন প্রযুক্তি এখন আর কল্পকাহিনি নয়। মাল্টিমোডাল এআই ও রিয়েল-টাইম ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি কম্পিউটারকে শুধু লেখা তৈরি করার ক্ষমতাই দিচ্ছে না; বরং মানুষের মতো দেখতে, শুনতে এবং কথাও বলতে সক্ষম করে তুলছে।

এআই এখন শুধু লিখতে পারে না

এতদিন এআইয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ মূলত লেখা বা কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রশ্ন করলে এআই লিখে উত্তর দিত, ছবি দিলে ছবিতে কী আছে তা ব্যাখ্যা করত। কিন্তু নতুন প্রজন্মের এআই মডেলগুলো একই সঙ্গে লেখা, ছবি, অডিও ও ভিডিও বিশ্লেষণ করতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তিকে বলা হয় মাল্টিমোডাল এআই

‘মোডালিটি’ বলতে বোঝায় যোগাযোগ বা তথ্যের ধরন- যেমন লেখা, অডিও, ভিডিও ও ছবি। কোনো এআই যখন একই সময়ে এসব বিভিন্ন ধরনের তথ্য বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারে, তখন তাকে মাল্টিমোডাল এআই বলা হয়।

ধরা যাক, আপনি ল্যাপটপের ক্যামেরার সামনে একটি ছেঁড়া তার ও সার্কিট বোর্ড ধরলেন। এরপর বললেন, ‘এই সার্কিটটি কীভাবে জোড়া দেব?’

এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সার্কিটটি দেখবে, আপনার কথা শুনবে এবং সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠে উত্তর দিয়ে আপনাকে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিতে পারবে। শুধু তা-ই নয়, আধুনিক ভয়েস এআইয়ের কণ্ঠে মানুষের মতো স্বাভাবিক ওঠানামা, বিরতি, হাসি ও আবেগও থাকতে পারে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই কণ্ঠস্বরের নকল

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং কিছুটা উদ্বেগজনক দিক হলো ভয়েস ক্লোনিং বা কণ্ঠস্বর নকলের প্রযুক্তি।

আগে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের কণ্ঠে কথা বলানোর জন্য দীর্ঘ সময়ের রেকর্ড করা অডিও এবং ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতো। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কিছু প্রযুক্তি খুব অল্প সময়ের কণ্ঠের নমুনা থেকেই একজন মানুষের কণ্ঠস্বরের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে।

কণ্ঠস্বরের উচ্চতা, টোন, কথা বলার গতি, উচ্চারণ ও আঞ্চলিক টান- এসব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এআই তৈরি করতে পারে সেই ব্যক্তির কণ্ঠের একটি কৃত্রিম সংস্করণ। এরপর সেই কণ্ঠে দীর্ঘ লেখা, গল্প কিংবা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধও পড়ানো সম্ভব।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি- ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির সক্ষমতা নির্ভর করে ব্যবহৃত এআই মডেল, প্রযুক্তি, অডিওর মান এবং নিরাপত্তা নীতির ওপর। তাই ‘মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিওতেই যেকোনো কণ্ঠ নিখুঁতভাবে নকল করা যায়’—এমন দাবি সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।

চিকিৎসায় প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার

ভয়েস ক্লোনিংয়ের সবচেয়ে মানবিক ব্যবহারগুলোর একটি দেখা যাচ্ছে চিকিৎসাক্ষেত্রে।

কঠিন রোগ, দুর্ঘটনা বা অস্ত্রোপচারের কারণে যেসব মানুষ নিজেদের কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন, তাদের পুরনো রেকর্ড করা কণ্ঠের নমুনা ব্যবহার করে ব্যক্তিগতকৃত কৃত্রিম কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

এর ফলে তারা প্রযুক্তির সাহায্যে আবারও নিজেদের পরিচিত কণ্ঠের কাছাকাছি কণ্ঠে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। যোগাযোগের এই সক্ষমতা অনেক রোগীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

মুদ্রার অন্য পিঠ: ডিপফেক অডিও

তবে যেকোনো শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো ভয়েস ক্লোনিংয়েরও অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।

ধরা যাক, আপনার কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর কণ্ঠস্বর নকল করে কেউ আপনাকে ফোন করল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো, ‘আমি বিপদে পড়েছি, এখনই টাকা পাঠাও।’

কণ্ঠস্বরটি পরিচিত হওয়ায় আপনি হয়তো বিশ্বাস করে ফেললেন। কিন্তু পরে জানা গেল, ফোনটি করেছিলেন কোনো মানুষ নয়-এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই কণ্ঠ।

এ ধরনের প্রতারণাকে বলা হয় ডিপফেক অডিও। শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, পরিচয় জালিয়াতি ও সামাজিক বিভ্রান্তি তৈরিতেও এই প্রযুক্তির অপব্যবহার হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা এআই-তৈরি অডিও শনাক্ত করার বিভিন্ন পদ্ধতি, ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক এবং শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

তবে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো- শুধু কণ্ঠস্বর শুনে কোনো জরুরি আর্থিক অনুরোধকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। পরিচিত ব্যক্তিকে অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই করা উচিত।

যন্ত্রের চোখ, মানুষের বিচারবোধ

কম্পিউটার এখন আমাদের দেখতে পারে, শুনতে পারে এবং মানুষের মতো কণ্ঠে কথা বলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সঙ্গে আরও স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা, গ্রাহকসেবা ও দৈনন্দিন জীবনে এই প্রযুক্তি অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তবে এআই যতই নিখুঁতভাবে কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করুক না কেন, সত্য-মিথ্যা যাচাই, নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় মানুষের বিচারবোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এআইকে ভয় পাওয়ার বদলে এর পেছনের বিজ্ঞানকে বোঝা, সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং অপব্যবহার থেকে সতর্ক থাকাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

লেখক: নওশেদ আলম, শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

তথ্যসূত্র: এমআইটি টেকনোলজি রিভিউয়ের মাল্টিমোডাল আর্কিটেকচারবিষয়ক প্রতিবেদন এবং ওপেনএআইয়ের ভয়েস ইঞ্জিন–সংক্রান্ত নিরাপত্তা নথি।

বাংলাদেশ সময়: ১০:১৭:০৪ ● ২০ বার পঠিত




আর্কাইভ