কুয়াকাটা সমুদ্রে বিলীন জমি, এবার সুবিধাজনক স্থানে দাবি করে দখলের চেষ্টা!

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » কুয়াকাটা সমুদ্রে বিলীন জমি, এবার সুবিধাজনক স্থানে দাবি করে দখলের চেষ্টা!
সোমবার ● ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

কুয়াকাটা সমুদ্রে বিলীন জমি, এবার সুবিধাজনক স্থানে দাবি করে দখলের চেষ্টা!

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)

 

পটুয়াখালীর পর্যটন নগরী কুয়াকাটায় সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি সুবিধাজনক জায়গায় নিজেদের দাবি করে এবার দখল ও ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে সেখানকার কয়েকজনের বিরুদ্ধে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে মহিপুর থানা থেকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

 

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুয়াকাটা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায় ১৯৯৬ সালে ১৩৪৬ খতিয়ানের ৫১৭৮ দাগে ৫০টি দুস্থ ও অসহায় পরিবারকে ৬ শতক জমির ওপর সরকার ঘর নির্মাণ করে দেয়। পরবর্তীতে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরে ওই ঘরবাড়ি ও জমি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়।

 

এরপর ক্ষতিগ্রস্ত ৫০টি পরিবারকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আওতায় কুয়াকাটা ও আশপাশের এলাকায় প্রত্যেককে ৩ শতক জমিসহ ঘর নির্মাণ করে দেয় সরকার। অভিযোগ রয়েছে, নানা অজুহাতে অনেকে এসব ঘর বিক্রি করে পুনরায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালে এসে বসবাস শুরু করেন।

 

প্রায় দুই বছর আগে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া ওই জমি ফেরত চেয়ে ১৫ থেকে ২০ জন সুবিধাভোগী সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর তারা সৈকতসংলগ্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে বিনিয়োগকারীদের ক্রয়কৃত ও ভোগদখলীয় জমি নিজেদের দাবি করে কয়েক দফা দখলের চেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

কুয়াকাটায় বিনিয়োগকারী অ্যাডভোকেট সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের সহায়তায় থাকার জায়গা নেই দাবি করে তার জায়গার সামনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালে কয়েকজন ঘর নির্মাণ করেছেন। আব্বাস, আব্দুর রব, রশিদ, লাল মিয়া ও ফাতেমাসহ কয়েকজন তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সোমবার সকালে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জোরপূর্বক একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেন। তার কেয়ারটেকার চান মিয়া বাধা দিলে তাকে খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয়। পরে মহিপুর থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘর নির্মাণে বাধা দেয়। এ সময় ঘর নির্মাণকারীরা পুলিশের ওপরও চড়াও হন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলেও নির্মাণ করা টিনের ঘরটি সেখানে রয়ে যায়।

 

ঘর নির্মাণকারীরা দাবি করেন, তারা সরকারের বিরুদ্ধে জমি ফেরত চেয়ে মামলা করেছেন। সেই কারণেই সেখানে ঘর নির্মাণ করছেন। আদালত থেকে জমি দখলের বিষয়ে কোনো রায় পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তারা পুলিশকে জানান, বিষয়টি কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক জানেন।

 

অভিযোগ রয়েছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড আঃ রবসহ প্রত্যেককে ঘর সরিয়ে নেওয়ার জন্য মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ দিলেও অনেকে সেখান থেকে সরে যাননি।

 

কুয়াকাটা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আলী হায়দার শেখ বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে জমি ফেরতের মামলা করে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে দাবি করে দখল করা এবং পরে মোটা অংকের টাকা আদায় করাই তাদের উদ্দেশ্য।

 

তিনি আরও বলেন, কুয়াকাটা আদর্শ গ্রামে বসবাস করা ৫০টি পরিবারকে সিডরের পর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের নির্মাণ করা ঘর সমুদ্রসৈকত থেকে দূরে হওয়ায় অনেকে সেসব ঘর বিক্রি করে আবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরের সরকারি জমিতে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে পাটের বস্তা বা চট কিংবা ত্রিপল টানিয়ে বসবাস শুরু করলেও পরে অসহায় ও দুস্থতার অজুহাতে কাঁচা ঘর নির্মাণ করে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

কুয়াকাটা গ্র্যান্ড পার্ল হোটেল কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, তাদের জমির সামনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালে বসবাস করা বাবুল, আমির, জাকির ও আজিজের চারটি ঘর সরিয়ে দিতে ১২ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। অন্যথায় তারা সেখান থেকে সরবেন না বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

 

কুয়াকাটার বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী সাগরকন্যাকে বলেন, কোটি টাকা ব্যয়ে জমি কেনার পর এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে তারা হতাশ হচ্ছেন।

 

কলাপাড়া পৌর বিএনপির সহসভাপতি ও দলিল লেখক আঃ মান্নান অভিযোগ করেন, তার জমিও কয়েকবার দখলের চেষ্টা করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, গ্রুপটি জমি ফেরত চেয়ে আদালতে মামলা করেছেন। শুধু মামলা দায়ের করেই কিছু লোকের ইন্ধনে অসৎ উদ্দেশ্যে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া জমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে দাবি করে দখলের পাঁয়তারা করছেন কিছু লোক। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে বিনিয়োগকারীরা কুয়াকাটায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন।

 

শশী কটেজের মালিক জানান, তার জমিতে একটি কটেজ রয়েছে। সেখানে আরও পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। সোমবার কটেজের সামনে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জোরপূর্বক টিনের ঘর নির্মাণ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দিলেও ঘরটি সেখানে রয়ে যায়।

 

তিনি অভিযোগ করেন, আব্বাস, খালেকসহ কয়েকজন তার জমির সম্মুখভাগ দখল করে ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বিভিন্ন সময় তার কটেজে পর্যটকদের প্রবেশে বাধা দেওয়াসহ নানা ধরনের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা এবং কেয়ারটেকারকে মারধরের অভিযোগও করেন তিনি। তাদের অত্যাচারে বিনিয়োগ রেখে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলেও জানান তিনি।

 

মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামীম হাওলাদার বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ পাঠিয়ে দখল কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য দুই পক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে থানায় আসতে বলা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

 

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ইয়াসীন সাদেকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাথে কথা বলা যায়নি।

বাংলাদেশ সময়: ২২:৩৮:৪৯ ● ১৭ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ