
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, গলাচিপা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, কক্ষ ও জনবলের সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন ইনডোরে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন। গলাচিপার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার মানুষেরও অন্যতম ভরসাস্থল হওয়ায় হাসপাতালটিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর চাপ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত বছর ধরে এখানে কোনো আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন নেই। ফলে গর্ভবতী নারীসহ বিভিন্ন রোগীকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এ ছাড়া ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন না থাকায় বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ মেশিন দিয়েই চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এতে অনেক সময় মানসম্মত প্রতিবেদন পাওয়া যায় না এবং রোগীদের বাইরে গিয়ে ডিজিটাল এক্স-রে করাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ভবনটিও দীর্ঘদিনের পুরোনো। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কক্ষের ছাদ এবং দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। নিয়মিত মেরামত করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নতুন ভবন নির্মাণের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি কক্ষসংকটের কারণে অনেক সময় একই কক্ষে একাধিক চিকিৎসককে রোগী দেখতে হয়। এতে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা ও স্বাচ্ছন্দ্যে চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে সরকারের বরাদ্দকৃত ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিএজেন্ট অনেক সময় অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
গলাচিপার বাসিন্দা নিকর হাওলাদার বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য এই হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখানে আল্ট্রাসনোগ্রাম নেই, আধুনিক এক্স-রে নেই, ভবনও অনেক পুরোনো। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, চিকিৎসক ও জনবল বৃদ্ধি এবং ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘গলাচিপার পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাঙ্গাবালী ও দশমিনা থেকেও প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। মাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল হওয়ায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় শয্যা না থাকায় মেঝেতেও রোগীদের রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘রোগীর সংখ্যার তুলনায় ওষুধ ও পরীক্ষার রিএজেন্টের বরাদ্দ খুবই সীমিত। প্রতিদিন নতুন করে ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি হন এবং হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বরাদ্দ বাড়ানো হলে আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট প্রসঙ্গে ডা. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান ডিজিটাল যুগেও আমরা বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন দিয়ে সেবা দিচ্ছি, যা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। গাইনি বিভাগের আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও প্রায় সাত বছর ধরে নেই। নতুন মেশিনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে।’
হাসপাতাল ভবন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভবনটি বহু বছরের পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে ফাটল দেখা দেয় এবং নিয়মিত মেরামত করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন ভবন নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবগত। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হলে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।