নিকোলাস বিশ্বাস
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী বাবা দিবস (ফাদার্স ডে) পালিত হয়। আজ রবিবার (২১ জুন) বাবা দিবস। পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ এই দিনটি। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরামর্শদাতা, অভিভাবক এবং জীবনের পথপ্রদর্শক। সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁর অবদান অবর্ণনীয়- এ বাস্তবতাই বাবা দিবসের গুরুত্বকে আরও গভীর করে তোলে।
মানবজীবনে বাবার ভূমিকা অনন্য। জন্মের পর থেকেই সন্তান বাবার স্নেহ, সুরক্ষা ও দিকনির্দেশনার মধ্যে বেড়ে ওঠে। তিনি সন্তানকে নৈতিক মূল্যবোধ, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে দেন। অনেক সময় বাবারা নিজেদের কষ্ট আড়াল করে পরিবারের সুখ নিশ্চিত করেন। এই নিঃশব্দ ত্যাগই পরিবারকে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছল রাখে।
বাবা দিবসের ইতিহাসও অনুপ্রেরণাদায়ক। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে এ দিবসের ধারণা জন্ম নেয়। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সোনোরা স্মার্ট ডড। ১৯০৯ সালে মা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি অনুভব করেন- যেসব বাবা সন্তানদের জন্য সমানভাবে ত্যাগ স্বীকার করেন, তাঁদের সম্মান জানানোর জন্যও একটি দিন থাকা উচিত।
তিনি অনুপ্রাণিত হন তাঁর বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্টের জীবন থেকে, যিনি ছিলেন একজন গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ছয় সন্তানকে একাই বড় করে তোলেন তিনি। তাঁর এই অসাধারণ দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগই সোনোরাকে বাবা দিবস প্রবর্তনের প্রেরণা জোগায়। ১৯১০ সালের ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেন শহরে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়।
বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক আবেগে গভীর হলেও অনেক সময় তা প্রকাশে সংযত। একজন বাবা সন্তানের সাফল্যে গর্ব করেন, ব্যর্থতায় শক্তি দেন, আর জীবনের কঠিন সময়ে নীরব আশ্রয় হয়ে দাঁড়ান। সন্তানের ছোট ছোট চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তিনি নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দেন- এই নিঃস্বার্থতা পরিমাপের কোনো মানদণ্ড নেই।
বিশ্ব বাবা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামাজিক ও নৈতিক উপলক্ষ। এই দিনে সন্তানরা উপহার, শুভেচ্ছা, পারিবারিক সময় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনও আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে, যা সমাজে বাবার ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়।
বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে পারিবারিক সম্পর্ক অনেক সময় দূরত্বে পড়ে যায়। এ বাস্তবতায় বাবা দিবস পরিবারকে আবার কাছাকাছি আনার একটি সুযোগ তৈরি করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়- বাবার প্রতি ভালোবাসা কেবল অনুভূতিতে নয়, দায়িত্ব ও আচরণেও প্রকাশিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাবা দিবস তুলনামূলকভাবে নতুন একটি সামাজিক চর্চা। এটি রাষ্ট্রীয় কোনো ঐতিহ্য নয়; বরং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাব, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে এবং বিশেষ করে ২০০০-এর দশকে শহরকেন্দ্রিক তরুণ সমাজের মধ্যে এর প্রচলন বাড়ে। বর্তমানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট সেক্টর ও সামাজিক সংগঠন পর্যায়ে দিনটি বিভিন্নভাবে পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের পারিবারিক সংস্কৃতিতে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম থেকে শহর- সব জায়গাতেই একজন বাবা পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা চাকরিজীবী- যে পেশাতেই থাকুন না কেন, পরিবারের কল্যাণই তাঁর অগ্রাধিকার।
এ প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমার বাবা তুফান বিশ্বাস (১৯২৮-২০২১)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। গত ৩ জুন তাঁর প্রয়াণের ৫ম বার্ষিকী ছিল। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও মূল্যবোধ আজও আমাদের জীবনে গভীরভাবে উপস্থিত। তিনি যে ত্যাগ ও আদর্শ রেখে গেছেন, তা আমাদের কাছে চিরস্মরণীয়। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধ বিষয়ক কর্মপরিধিতে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-এর মতো সংস্থার কাজও পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক ও মানবকল্যাণকে গুরুত্ব দেয়- যা বাবা দিবসের মানবিক বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, বাবা দিবস বাবাদের ত্যাগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধকে সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী দিন। একজন বাবা পরিবারের ভিত্তি, শক্তি ও আশ্রয়। তাই আজ ২১ জুন ২০২৬ বিশ্ব বাবা দিবসে আমরা সকল বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। কেবল একটি দিনে নয়, বছরের প্রতিটি দিনই তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত
ই-মেইল: gonomaddyom@gmail.com