
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
বরগুনার আমতলী উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বিতরণ কমিটির অনুমোদন ছাড়াই চার বছরে একাধিক অননুমোদিত ব্যাংক একাউন্টে প্রায় ৯১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা মো. তোফাজ্জেল হোসেনের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমতলী সোনালী ব্যাংক শাখা, বরগুনার কোর্ট বিল্ডিং শাখা এবং বরিশালের চকবাজার ও কলেজ রোড শাখায় একাধিক একাউন্টে নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার অর্থ জমা হয়ে তা তুলে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভাতা পে-রোল অনুযায়ী সাধারণত উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বিতরণ কমিটির অনুমোদনে নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টে অর্থ জমা হওয়ার কথা।
তদন্তে দেখা গেছে, তোফাজ্জেল হোসেনের নামে একটি অনুমোদিত সঞ্চয়ী একাউন্ট থাকলেও তার পাশাপাশি একটি এমডিএস (ডিপিএস) একাউন্ট, দুটি অননুমোদিত সঞ্চয়ী একাউন্ট, তার স্ত্রী শাহানারা কাজলের নামে একটি একাউন্ট এবং বোন লুৎফা বেগমের একাউন্টে ভাতার অর্থ জমা হয়েছে। এসব একাউন্ট খোলা হয় আমতলী শাখায়, যখন সেখানে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন মো. কাওছার মোল্লা ও বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি।
আমতলী সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাগরকন্যাকে জানান, বিষয়টি নজরে আসার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এমডির বিশেষ স্কোয়াড তদন্তে নেমে জালিয়াতির সত্যতা পায়। তদন্তকালে লিখিত বক্তব্যে মো. তোফাজ্জেল হোসেন নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
তোফাজ্জেল হোসেন ৪৭০ নম্বর গেজেট অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়ে আসছেন। তবে স্থানীয় একাধিক মুক্তিযোদ্ধার দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স কম থাকায় তিনি কোনো যুদ্ধে অংশ নেননি।
আমতলীর বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, খালেদা বেগম ও তহমিনা ইউনুস নামে কাউকে আমি চিনি না। অথচ আমার ভাতার টাকা কীভাবে তাদের একাউন্টে গেল, বুঝতে পারছি না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে তোফাজ্জেল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, তার স্ত্রী ও আমতলী সবুজবাগ মুক্তিযোদ্ধা স্কুলের শিক্ষক শাহানারা কাজল বলেন, আমি কোনো মুক্তিযোদ্ধা নই এবং কোনো ভাতাও গ্রহণ করিনি। আমার সঙ্গে এ ধরনের কোনো আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক নেই। কিছু জটিলতা হয়েছিল, তবে আমার স্বামী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।
তিনি দাবি করেন, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা তাকে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসিয়েছেন।
আমতলী সোনালী ব্যাংক শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক, বর্তমানে পটুয়াখালীর কলাপাড়া শাখায় কর্মরত মোহাম্মদ জুলকার বিন খালেদ সাগরকন্যাকে জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে অস্বাভাবিক লেনদেন নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং পরে বিষয়টি তদন্তে যায়।
সাবেক ব্যবস্থাপক বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি বলেন, অনুমোদন ছাড়া এসব একাউন্টে টাকা ঢোকার বিষয়টি ধরা পড়ার পর আমি সংশ্লিষ্ট একাউন্টগুলো বন্ধ করে দিই।
আরেক সাবেক ব্যবস্থাপক মো. কাওছার মোল্লা বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে বিএফটিএন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একাউন্ট নম্বরে টাকা পাঠানো হয়। পে-রোলের বাইরে এভাবে অর্থ পাঠানো হলে তা শনাক্ত করা কঠিন।
তিনি আরও জানান, অনিয়মের বিষয়টি লিখিতভাবে স্বীকার করার পর তোফাজ্জেল হোসেন ২২ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।
সোনালী ব্যাংকের বরিশাল অঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহমুদুল হক জানান, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।