
মো. মহসীন খান
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলবাসীর জন্য একটি ভয়াবহ দিন ছিল। ওই দিনে উপকূলের ওপর দিয়ে আঘাত হেনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করে ভোলা ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলীয় এলাকা লন্ডভন্ড করে দেয়। বহু মানুষ প্রাণ হারান। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে অনেকেই পথেমুখী হন।
অনুসন্ধানসম্মত তথ্যে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড়টি ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়। ক্রমে শক্তিশালী হয়ে তা উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়। ১১ নভেম্বর এর সর্বোচ্চ গতিবেগ হয়ে পৌঁছে ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার। ১২ নভেম্বর গভীর রাতেই উপকূলে আঘাত হানে। জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অংশ ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। ওই ঘূর্ণিঝড়ে অনেকে প্রাণ হারায়; প্রায় পাঁচ লাখ লোকের মৃত্যুর তথ্য ট্রজেডির মাত্রা বোঝায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানে বহু মানুষ মারা যায়; একটি এলাকার প্রায় ৪৬ শতাংশ লোকের মৃত্যু হৃদয়বিদারক ব্যথার উদাহরণ।
ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের আগে ও পরে উপকূলের ওপর দিয়ে আরও অনেক ঝড় বয়ে গেছে। ১৮৭৬ সালে বাকেরগঞ্জ সাইক্লোনে প্রচুর প্রাণহানি হয়েছে। পরবর্তীেও ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়সহ সিডর (২০০৭), নার্গিস (২০০৮), আইলা (২০০৯), মহাসেন (২০১৩), নিলোফর (২০১৪) ও রোয়ানু (২০১৬) মতো ঝড় উপকূলে আঘাত হানেছে। তবু ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঝড়ের ভয়াবহতা অন্য কোন ঝড় অতিক্রম করতে পারেনি।
প্রতিবছর স্বল্প পরিসরে হলেও ওই দিনটি নানা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম স্মরণ করে। অনেক অসহায় পরিবার এখনো স্বজনহারার কষ্ট নিয়েই জীবন যাপন করছেন। তাদের বেদনা মুছানো সম্ভব না হলেও, দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতনতা বাড়ানো যায়। তাই বছরের অন্তত এক দিন উপকূলবাসীর প্রতি বিশেষ নজর রাখার একটি দিন থাকা প্রয়োজন।
এই দিনটিকে ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলে উপকূলের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশের যোগ্য দৃষ্টিপাত বাড়বে। ১২ নভেম্বরকে স্থানীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ওয়ার্ল্ড কোস্টাল ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলে উপকূল জীবনের সমস্যা ও প্রজেক্টগুলো বারবার আলোচিত হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি বিশেষ দিন থাকলে দুর্যোগপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় স্থিতিশীল পদক্ষেপ নেয়া সহজ হবে।
লেখক- সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ