
মেজবাহউদ্দিন মাননু
সমুদ্রসৈকত, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, রাখাইন সংস্কৃতি, লেম্বুর বন ও কচ্ছপখালী খাল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় বাড়ছে মানুষের আগ্রহ। পর্যটকের চাপের সঙ্গে বাড়ছে সড়ক, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিনোদনসুবিধার চাহিদাও। এ পরিস্থিতিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা পৌরসভায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলছে।
সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ, ফুটপাত, সাইক্লোন শেল্টার, পানি সরবরাহব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন, শিশুপার্ক ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন খাতে নেওয়া হয়েছে একাধিক প্রকল্প। কিছু কাজ বাস্তবায়নাধীন, কিছু দরপত্র ও প্রক্রিয়াগত পর্যায়ে রয়েছে। আবার কয়েকটি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকল্প প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটার নাগরিকসেবা ও পর্যটন অবকাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, বর্তমানে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায় ১২০ কোটি টাকা, ইউআইআইপি কুয়েত প্রকল্পে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, এসইউইউআইডিপি টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মাধ্যমে ৪৮ কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে কিছু কাজ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কয়েকটি কাজের দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে।
সড়ক, ড্রেন ও দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে উন্নয়ন:
পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পের আওতায়। পরিবেশগত প্রশমন কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ইউনিব্লক দিয়ে প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। রাখাইন পল্লি কেরানীপাড়ার ভেতরে ৪৮৫ মিটার আরসিসি সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া ৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার ২৪৫ মিটার সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে।
উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় পাঞ্জুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনতলাবিশিষ্ট সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ৬৭৩ টাকা। মীরাবাড়ি মাদ্রাসায় একই ধরনের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৫৩৯ টাকা।
এ ছাড়া প্রায় ৮০০ মিটার সড়ক আরসিসি দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩ কিলোমিটার ৭১০ মিটার আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তিনটি আরসিসি আর্চ ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। দুটি আবাসন এলাকায় ৫৮৮ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৮০ লাখ টাকা।
কচ্ছপখালী খাল ঘিরে পর্যটন আকর্ষণের পরিকল্পনা:
কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কচ্ছপখালী খালকে ঘিরে সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পৌরশহরের প্রাণকেন্দ্রের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, হাঁটার পথ, বেঞ্চ ও ঘাটলা নির্মাণ, প্যাডল বোট সরবরাহ এবং বৃক্ষরোপণের জন্য ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, প্রকল্পটি ইতিমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রসৈকতের বাইরে পর্যটকদের জন্য নতুন বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে খালটির প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে লতাচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খাস পুকুরের চারপাশে হাঁটার পথ ও ঘাটলা নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনে ২ কোটি ৬৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পশ্চিম কুয়াকাটায় ডিবিএল ল্যান্ড-সংলগ্ন খাসজমিতে শিশুপার্ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া দোভাষীপাড়া সেতু পর্যন্ত সড়কে এবং সমুদ্রবাড়ি রিসোর্ট থেকে নীলাঞ্জনা সড়ক পর্যন্ত ড্রেনের ওপর প্রশস্ত ফুটপাত নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের চলাচল ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় বিনিয়োগ:
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে নিরাপদ পানির সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও কুয়াকাটার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের কাজ চলছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে আটটি পরীক্ষামূলক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা। চারটি উৎপাদক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৯২ টাকা এবং চারটি পাম্প হাউস নির্মাণে ৯৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৬ টাকা।
এ ছাড়া ৮ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ টাকা। এ কাজ চলমান রয়েছে। এক হাজার গৃহসংযোগের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার, উঁচু পানির ট্যাংক, ২ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটনবান্ধব পরিকল্পনার তাগিদ:
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, ‘প্রায় ২০০ কোটি টাকার চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কুয়াকাটার অবকাঠামোতে পরিবর্তনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পর্যটননগরীর ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য শুধু সড়ক-ড্রেনেজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পর্যটকের বিনোদন, হাঁটার পরিবেশ, রাতের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।’
কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের অন্যতম সদস্য ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কুয়াকাটায় একটি দৃষ্টিনন্দন ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। পৌরসভা বাসস্ট্যান্ড থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ওয়াকওয়ে, বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতি স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। এতে পর্যটকদের হাঁটার নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি হবে।’
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পরিবেশকর্মী কেএম বাচ্চু বলেন, জিরো পয়েন্ট চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বনাঞ্চল সৈকত পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতির মাধ্যমে আলোকিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য অন্তত ১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার সব সড়কে সৌরবাতি স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাতের কুয়াকাটার সৌন্দর্যও বাড়বে। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।
আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ:
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কুয়াকাটাকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করার জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কুয়াকাটা পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করার কাজ চলছে। একটি আধুনিক মানের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।’
কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, রাতের নিরাপত্তা, নাগরিকসেবা ও পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনার সমন্বয় জরুরি। চলমান প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে কুয়াকাটাকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।