
সাগরকন্যা আইটি ডেস্ক
ফাস্ট চার্জিং এখন প্রায় সব আধুনিক স্মার্টফোন ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। অনেক স্মার্টফোন মাত্র আধা ঘণ্টায় শূন্য থেকে প্রায় পূর্ণ চার্জ হয়ে যায়। বৈদ্যুতিক গাড়িতেও দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কম সময়ে ব্যাটারিতে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব হয়।
তবে ব্যাটারি চিরকাল একই সক্ষমতায় কাজ করে না। সময়ের সঙ্গে এর চার্জ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। ফাস্ট চার্জিংয়ে তুলনামূলক কম সময়ে ব্যাটারিতে বেশি বৈদ্যুতিক শক্তি প্রবেশ করানো হয় বলে অনেকের প্রশ্ন, এতে কি ব্যাটারির আয়ু দ্রুত কমে যায়?
বিজ্ঞানীদের মতে, ফাস্ট চার্জিং ব্যাটারির ক্ষয় কিছু ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দ্রুত চার্জিং ব্যবহার করলেই অল্প সময়ের মধ্যে ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে। আধুনিক স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে উন্নত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকে, যা তাপমাত্রা, ভোল্টেজ ও কারেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর চেষ্টা করে।
ফাস্ট চার্জিং কীভাবে কাজ করে?
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পুনঃচার্জযোগ্য ব্যাটারির মধ্যে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি অন্যতম। এর ভেতরে ক্যাথোড ও অ্যানোড নামে দুটি ইলেকট্রোড থাকে। এ দুটির মধ্যে লিথিয়াম আয়নের চলাচলের মাধ্যমেই ব্যাটারিতে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চয় ও সরবরাহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ফোন চার্জ দেওয়ার সময় লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে অ্যানোডে সঞ্চিত হয়। আবার ফোন ব্যবহার করার সময় এসব আয়ন বিপরীত দিকে ফিরে আসে এবং সেখান থেকেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
সাধারণ চার্জিংয়ের তুলনায় ফাস্ট চার্জিংয়ে বেশি কারেন্ট ব্যবহার করা হয়। ফলে একই পরিমাণ শক্তি তুলনামূলক কম সময়ে ব্যাটারিতে প্রবেশ করতে পারে।
চীনের জিয়াং জিয়াওটং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ঝিউয়ান জিয়াংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাধারণ চার্জিংয়ে কম কারেন্ট ব্যবহারের কারণে লিথিয়াম আয়নগুলো ধীরে ধীরে অ্যানোডের ভেতরে সঞ্চিত হয়। এতে ব্যাটারির তাপ উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপর চাপ তুলনামূলক কম থাকে। ফাস্ট চার্জিংয়ে বেশি কারেন্ট ব্যবহারের কারণে এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়।
তবে সব ব্যাটারি একই গতিতে চার্জ নেওয়ার জন্য তৈরি নয়। একটি ব্যাটারি কত দ্রুত চার্জ নিতে পারবে, তা নির্ভর করে এর রাসায়নিক উপাদান, অভ্যন্তরীণ গঠন এবং ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ওপর।
দ্রুত চার্জিংয়ের উপযোগী ব্যাটারিতে এমন উপাদান ও নকশা ব্যবহার করা হয়, যাতে লিথিয়াম আয়ন তুলনামূলক সহজে চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি ব্যাটারির ভেতরে বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ও তাপ উৎপাদন কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়।
ফাস্ট চার্জিংয়ে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
সব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিই ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সক্ষমতা হারায়। চার্জ ও ডিসচার্জের প্রতিটি চক্রে ব্যাটারির ভেতরে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর এসব পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাটারি আগের মতো চার্জ ধরে রাখতে পারে না।
ফাস্ট চার্জিং কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষয়প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এর অন্যতম কারণ লিথিয়াম প্লেটিং।
দ্রুত চার্জিংয়ের সময় লিথিয়াম আয়ন খুব দ্রুত অ্যানোডের দিকে যেতে থাকে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এসব আয়ন অ্যানোডের ভেতরে যথাযথভাবে সঞ্চিত হওয়ার পরিবর্তে অ্যানোডের পৃষ্ঠে ধাতব লিথিয়াম হিসেবে জমা হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকেই লিথিয়াম প্লেটিং বলা হয়।
এর ফলে ব্যাটারিতে কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপযোগী লিথিয়ামের পরিমাণ কমতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে ব্যাটারির সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ব্যাটারির অভ্যন্তরে ডেনড্রাইট নামের সূঁচের মতো কাঠামো তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এগুলো ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অতিরিক্ত তাপ কেন সমস্যা?
ফাস্ট চার্জিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাপ।
ব্যাটারির ভেতরে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় বৈদ্যুতিক প্রতিরোধের কারণে স্বাভাবিকভাবেই কিছু তাপ উৎপন্ন হয়। চার্জিংয়ের হার যত বাড়ে, তাপ উৎপাদনের পরিমাণও তত বাড়তে পারে।
ব্যাটারির জন্য অতিরিক্ত তাপ ক্ষতিকর। উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে ব্যাটারির বিভিন্ন উপাদানের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে।
অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রায় ব্যাটারি ফুলে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা বিরল ক্ষেত্রে আগুন লাগার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। ব্যাটারির অভ্যন্তরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে দ্রুত তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করার বিপজ্জনক প্রক্রিয়াকে বলা হয় থার্মাল রানঅ্যাওয়ে।
তবে আধুনিক ডিভাইসে এ ধরনের ঝুঁকি কমানোর জন্য একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে।
ফোন নিজেই চার্জিংয়ের গতি কমিয়ে দেয়
আধুনিক স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা বিএমএস ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থা ব্যাটারির ভোল্টেজ, কারেন্ট ও তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করে।
তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার বেশি বেড়ে গেলে ডিভাইস নিজে থেকেই চার্জিংয়ের গতি কমিয়ে দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম হলে চার্জিং সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
এ কারণেই রোদে বা অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ফোন চার্জ দেওয়ার সময় অনেক ডিভাইসে তাপমাত্রা-সংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেখা যায়।
অর্থাৎ, আধুনিক ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তি এমনভাবে তৈরি করা হয় না যে সর্বোচ্চ গতিতে সব সময় চার্জ চলবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী চার্জিংয়ের গতি কমানো বা বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকে।
ব্যাটারির আয়ু বাড়াতে কী করবেন?
ব্যাটারি ভালো রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। তাই সরাসরি সূর্যের আলো পড়ছে এমন জায়গায় ফোন, ল্যাপটপ বা অন্য কোনো ব্যাটারি চালিত ডিভাইস চার্জ না দেওয়াই ভালো।
গরম গাড়ির ভেতর রেখে ডিভাইস চার্জ দেওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত। একইভাবে অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশেও ব্যাটারি চার্জ দেওয়া ঠিক নয়। অত্যধিক ঠান্ডায় ব্যাটারির ভেতরে লিথিয়াম আয়নের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাধারণভাবে কক্ষের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ব্যাটারি ব্যবহারের জন্য উপযোগী। ডিভাইসের প্রস্তুতকারক যে তাপমাত্রার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেটি অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
এ ছাড়া ল্যাপটপ বা অন্য ডিভাইস দীর্ঘ সময় অপ্রয়োজনে চার্জারে সংযুক্ত করে রাখা এড়িয়ে চলা ভালো। অনেক আধুনিক ডিভাইসে ব্যাটারি সুরক্ষার জন্য চার্জ সীমিত রাখার সুবিধাও রয়েছে।
দৈনন্দিন ব্যবহারে প্রতিবার ব্যাটারি পুরোপুরি শূন্য করে ফেলা বা প্রতিবার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করাও জরুরি নয়। অনেক ক্ষেত্রে মাঝামাঝি চার্জের পরিসরে ব্যাটারি ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাটারি স্বাস্থ্যের জন্য সুবিধা হতে পারে।
তাহলে ফাস্ট চার্জিং কি ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়- যদি ফোন ও চার্জারটি সেই প্রযুক্তির জন্য তৈরি হয় এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা হয়।
ফাস্ট চার্জিং ব্যাটারির ক্ষয় কিছুটা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে অতিরিক্ত তাপ ও উচ্চ চার্জিং হারের কারণে। কিন্তু আধুনিক স্মার্টফোনে থাকা ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
তাই ফাস্ট চার্জিংকে সরাসরি ‘ব্যাটারি নষ্ট করার প্রযুক্তি’ বলা ঠিক নয়। বরং বলা যায়, দ্রুত চার্জিং ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত তাপ ও বৈদ্যুতিক চাপ তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির ক্ষয় ত্বরান্বিত করার একটি কারণ হতে পারে।
সঠিক চার্জার ব্যবহার, অতিরিক্ত গরম পরিবেশ এড়িয়ে চলা এবং ডিভাইসের নিজস্ব চার্জিং ও ব্যাটারি-সুরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখাই ব্যাটারির আয়ু দীর্ঘ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা
সূত্র: লাইভ সায়েন্স