
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুমিরমারা গ্রামের শ্রমজীবী ইমাম হোসেনের জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরেছে হাঁস-মুরগির খামারকে ঘিরে। একটি ইনকিউবেটর মেশিন তার খামার ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন নিয়মিত ডিম বিক্রির পাশাপাশি প্রতি মাসে শত শত হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করে বাড়তি আয় করছেন তিনি।
৪২ বছর বয়সী ইমাম হোসেন জানান, প্রায় ২১ বছর আগে বিয়ের পর কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট পরিসরে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন শুরু করেন। গত চার বছর ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন করে ডিম উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। এছাড়া ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা উৎপাদনও করতেন।
তবে প্রাকৃতিকভাবে মা হাঁসের মাধ্যমে বাচ্চা ফোটাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হতো তাকে। প্রায় ২৮ দিন তা দেওয়া এবং পরে বাচ্চা পালনের কারণে একটি হাঁস দীর্ঘ সময় ডিম দেওয়া বন্ধ রাখত। ফলে উৎপাদন কমে যেত এবং আয়ও সীমিত থাকত।
এই অবস্থায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উন্নয়ন সংস্থা হীড বাংলাদেশের মাধ্যমে ইনকিউবেটর মেশিনে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটানোর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরে সংস্থাটির কাছ থেকে একটি ইনকিউবেটর বিনামূল্যে পান।
এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে তার খামারের চিত্র। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ২৫০ থেকে ২৮০টি বাচ্চা ফোটাতে পারছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৮০টি ডিম বিক্রি করছেন। ইনকিউবেটরের কারণে মা হাঁস ও মুরগির ডিম উৎপাদন বন্ধ থাকে না। স্বাভাবিকভাবে ডিম দেওয়ার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই তারা আবার ডিম দিতে শুরু করে।
ইমাম হোসেন বলেন, ‘এ পর্যন্ত চারবার হ্যাচারির মাধ্যমে ডিম ফুটিয়েছি। মুরগির বাচ্চা ফোটাতে ২১ দিন এবং হাঁসের জন্য ২৮ দিন সময় লাগে। মুরগির ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাঁসের ক্ষেত্রে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ডিম থেকে বাচ্চা পাওয়া যায়।’
বর্তমানে তার খামারে ডিম উৎপাদনকারী প্রায় ১৩০টি হাঁস রয়েছে। এছাড়া শতাধিক মুরগির বাচ্চা রয়েছে। বাচ্চার একটি অংশ বিক্রি করেন, আবার কিছু বড় করে ডিম উৎপাদনের জন্য রেখে দেন।
হাঁস-মুরগির খামারের পাশাপাশি তিনি গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ এবং ফলদ গাছের বাগানও গড়ে তুলেছেন। স্ত্রী কোহিনুর বেগম ও তিন সন্তানকে নিয়ে এখন স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন। বড় মেয়ে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট মেয়ে দশম শ্রেণিতে এবং ছেলে কোয়াছার প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে।
তবে খামারের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণে বিদ্যুতের সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
হীড বাংলাদেশ পাখিমারা অফিসের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইব্রাহিম খান বলেন, “পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় হীড বাংলাদেশ বাস্তবায়িত স্পেশাল প্রোগ্রাম-ডেভেলপমেন্ট (এগ্রিকালচার)-এর আওতায় স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে ইনকিউবেটর মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে হাঁস-মুরগির বাচ্চার সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খামারিদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে। পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, ইমাম হোসেনের এই সাফল্য এখন গ্রামের অন্য খামারিদেরও অনুপ্রাণিত করছে। তার খামারের উন্নয়ন দেখে অনেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।