
ফরাজী শিপু , চরফ্যাশন (ভোলা) থেকে
নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ বা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো জেলেদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর মতো যেন কেউ নেই। এমনই ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুই জেলে পরিবারের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র উঠে এসেছে স্থানীয়দের বক্তব্যে। স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।
ছয় মাস আগে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নান্নু মোল্লার ছেলে মিজান (৩২)। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। স্ত্রী রোজিনা তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে দিন পার করছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি মিজান। দীর্ঘ ছয় মাসেও তাঁর কোনো খোঁজ না মেলায় অনেকেই ধারণা করছেন তিনি আর বেঁচে নেই। তবে এখনো স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্ত্রী রোজিনা।
মিজানের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারটি চরম অর্থসংকটে পড়ে। কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় ধারদেনা ও আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোভাবে সংসার চলছে।
মিজানের স্ত্রী রোজিনা বলেন, স্বামী হারানোর পর তিন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে সংসার চলছে। এখনো সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাইনি। আমার বড় মেয়ে ফাতেমার বয়স ১৩ বছর।
অন্যদিকে, গত ১১ এপ্রিল তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারান উপজেলার আহাম্মদপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রয়াত জাহাঙ্গীরের ছেলে জেলে জসিম। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর নদীর তীর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিনের মতো রাতে মাছ ধরতে নদীতে যান জসিম। সকালে বাড়ি না ফেরায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে নদীতে তাঁর ট্রলার পাওয়া গেলেও জসিমের সন্ধান মেলেনি। দুই দিন পর নদীর তীর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জসিমও ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।
জসিমের স্ত্রী রুমা সাগরকন্যাকে বলেন, সেদিন রাতে আমার স্বামী (জসিম) স্বাভাবিকভাবেই ঘর থেকে বের হয়েছিল। কে জানত, এটাই তার শেষ যাওয়া হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, পরিবারটির খোঁজ নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নিখোঁজ জেলের নামে জেলে কার্ড থাকলে তাঁর পরিবারকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
এ বিষয়ে ভোলা জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জুন্নু রায়হান বলেন, মিজান ও জসিমের মতো বহু প্রকৃত জেলে এখনো জেলে কার্ড পাননি। অথচ জেলে নন- এমন অনেকেই সরকারি তালিকাভুক্ত হয়ে সুবিধা ভোগ করছেন। প্রকৃত জেলেদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।