
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাগেরহাট
বাগেরহাটের ফকিরহাটে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শারীরিক প্রতিবন্ধীদের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সম্ভাবনাময় এই প্রতিষ্ঠানটি অযত্ন-অবহেলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যুবকদের দক্ষতা অর্জন ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন মূলঘর এলাকায় প্রায় ৩ একর ৬০ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা কেন্দ্রটির প্রধান ফটক দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। পুরো এলাকা ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে, ভবনগুলো শ্যাওলা ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত। মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, টেইলারিং ও হাঁস-মুরগি পালন ট্রেডের জন্য আনা লেদ ও গ্রাইন্ডিং মেশিনসহ অন্তত ২১ ধরনের যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্যারেজে থাকা ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনও অচল হয়ে পড়েছে।
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি ২০১২ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার আগে এখান থেকে ৩১৯ জন প্রতিবন্ধী যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ভবনের অভাবই কেন্দ্রটি চালু না হওয়ার প্রধান কারণ। ২০১৭ সালে আংশিক সংস্কার করা হলেও হোস্টেল ভবন বসবাসের অনুপযোগী থাকায় কার্যক্রম আর শুরু করা যায়নি। ২০১৬ সালে জেলা নিলাম কমিটি ভবন অপসারণের সুপারিশ করলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২০ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছেও বিষয়টি জানানো হলেও কোনো সমাধান আসেনি।
দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতাও সমস্যাকে জটিল করেছে। ফকিরহাটে কেন্দ্রটি অবস্থিত হলেও এর দায়িত্বে রয়েছেন খুলনার তেরখাদা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, ফলে নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হচ্ছে। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ১১ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র একজন আবাসিক প্রশিক্ষক দায়িত্বে আছেন, যিনি আগামী মাসে অবসরে যাচ্ছেন।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের একজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘এই কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আগে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন প্রজন্ম সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত চালু হলে অনেকের জীবন বদলে যেতে পারে।’
স্থানীয় প্রতিবন্ধী যুবকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। আসলাম হোসেন নামে এক যুবক বলেন, ‘২০ বছর বয়স থেকে এই কেন্দ্র চালুর অপেক্ষায় আছি, এখন আমার বয়স ৩৪। প্রশিক্ষণ পেলে হয়তো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম।’
আরেক প্রতিবন্ধী তরুণ জামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা কাজ শিখতে চাই, কারও ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চাই না। কিন্তু কেন্দ্র বন্ধ থাকায় কোনো সুযোগ পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার নাথ বলেন, ‘আমি নিজে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছি। আবাসিক ভবনের সংকটের কারণেই কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। ভবন ও যন্ত্রপাতি সংস্কার করা গেলে কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা সম্ভব। জনবল ও ভবনের অনুমোদনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত চিঠি পাঠানো হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে এই কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করে শত শত প্রতিবন্ধী যুবককে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। বর্তমানে এলাকাবাসী দ্রুত সরকারি পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।