
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পাথরঘাটা (বরগুনা)
পাথরঘাটার নিভৃত পল্লীতে বসে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজও গুনছেন জীবনের শেষ দিনক্ষণ। দেশ স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়েছিলেন, হারিয়েছেন পরিবার, সহ্য করেছেন অকথ্য নির্যাতন- তবুও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রীর জীবন এখন শুধু অপেক্ষার আর বেদনার।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের তালুক চরদুয়ানী গ্রামে বসবাস করেন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রেরণায় অংশ নেন মনমথ রঞ্জন। মে মাসের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল তার বাড়িতে আশ্রয় নিলে তিনি তাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেন। ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরের অধীনে বামনা, পাথরঘাটা ও মঠবাড়িয়া এলাকায় সরাসরি যুদ্ধ করেন।
কিন্তু যুদ্ধের মাশুল ছিল ভয়াবহ। পাকবাহিনী তার বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বাবা মনোহর মিস্ত্রী, চাচা মথুরানাথ মিস্ত্রী ও কর্ণধর মিস্ত্রীসহ প্রতিবেশী মতিয়ার রহমানকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের লাশ খালে ফেলে দেওয়া হয়, যা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মা পারুল রাণী মিস্ত্রী ও চাচি পুষ্প রাণী নির্যাতনের শিকার হন। এক কথায়, পুরো পরিবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী বলেন, ‘বেঁচে আছে শুধু শরীর। প্রতিদিনই ৭১-এর বিভীষিকা আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। এখন শুধু ওপারে (মৃত্যু) যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’ তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় কোনো স্বীকৃতি বা সুবিধার কথা ভাবেননি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও তাকে স্বীকৃতির জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সবুজ মুক্তিবার্তায় তার নাম থাকলেও লাল মুক্তিবার্তায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে তালিকাভুক্তির জন্য চূড়ান্ত হলেও অজ্ঞাত কারণে বারবার তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিভিন্ন দপ্তরে জমা দিলেও তা রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
২০১৬ সালের ১৫ মার্চ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিবেদনেও তার ভাতার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এছাড়া তিনি ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কাছে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডারসহ একাধিক কর্তৃপক্ষের সনদপত্রও রয়েছে।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘আমাদের অনুসন্ধান ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার পরিবারের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায়। তার স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সম্মান পাওয়া উচিত।’
পাথরঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আলহাজ্ব এম.এ খালেক সাগরকন্যাকে বলেন, ‘মনমথ রঞ্জনের পরিবার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হওয়া সত্ত্বেও অবহেলার শিকার। আমরা একাধিকবার তার নাম সুপারিশ করেছি, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।’
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রীর একটাই প্রত্যাশা- মৃত্যুর আগে যেন তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পান, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হয়।