
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন বরগুনার যুবক ইসমাইল হোসেন (৪০)। কিন্তু রিয়াদে কর্মস্থলে মাটিচাপা পড়ে সেই স্বপ্নের করুণ পরিণতি হয়েছে। এখন তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রায় তিন লাখ টাকা প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এ টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। ফলে স্বামীর মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্ত্রী সোনিয়া বেগমের।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর এলাকায় পাইপলাইনের গভীর গর্তে কাজ করার সময় হঠাৎ মাটি ধসে ইসমাইল চাপা পড়েন। পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার খবর বিকেল ৫টার দিকে পরিবারের কাছে পৌঁছালে বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের আমজাদ হোসেনের বাড়িতে নেমে আসে শোকের মাতম।
নিহত ইসমাইল ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের বড় ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। আট বছর আগে সোনিয়া বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের চার বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, পড়াশোনা শেষ করেও দেশে কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে যান ইসমাইল। বিদেশ যেতে তাকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়। সৌদি আরবে গিয়ে কিছুদিন বেকার থাকার পর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে রিয়াদ বিমানবন্দর এলাকায় একটি চীনা কোম্পানির অধীনে কাজে যোগ দেন তিনি।
কাজ পাওয়ার পর সংসারের অভাব কিছুটা কমলেও বিদেশ যাওয়ার ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে পারেননি ইসমাইল। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, ধীরে ধীরে ঋণ শোধ করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু তার আগেই মাটির নিচে চাপা পড়ে নিভে গেল তার জীবন।
ইসমাইলের স্ত্রী সোনিয়া বেগম জানান, প্রতিদিনই স্বামীর সঙ্গে তার কথা হতো। বৃহস্পতিবার সকালেও কথা হয়েছিল। তখন ইসমাইল তাকে বলেছিলেন, তিনি কাজে যাচ্ছেন এবং দুপুরে আবার ফোন করবেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও ফোন না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে স্বামীর সহকর্মীদের ফোন করেন তিনি।
সোনিয়া বলেন, ‘বিকেল ৪টার দিকে সহকর্মীরা আমাকে জানান, ইসমাইল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। পরে জানতে পারি, মাটি ধসে চাপা পড়ে সে মারা গেছে।’
স্বামীকে হারিয়ে এখন চার বছরের সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সোনিয়া। এর মধ্যে স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচের কথা শুনে তার দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই!
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোনিয়া সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওখানকার লোকজন বলছে, মরদেহ দেশে আনতে প্রায় তিন লাখ টাকা লাগবে। অভাবের সংসার। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। সরকারের কাছে আমার আবেদন, আমার স্বামীর লাশটা যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। শেষবারের মতো যেন তাকে দেখতে পারি।’
ইসমাইলের বাবা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার তিন ছেলের মধ্যে ইসমাইলই বড়। আমাদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য ঋণ করে বিদেশ গিয়েছিল। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু মাটির চাপায় আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
ইসমাইলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছে তার পরিবার। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় প্রাণ হারানো ইসমাইলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করবে সরকার।