কলাপাড়া পৌরসভার পানিসেবায় নাগরিক ভোগান্তি, পাম্প নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

হোম » পটুয়াখালী » কলাপাড়া পৌরসভার পানিসেবায় নাগরিক ভোগান্তি, পাম্প নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
রবিবার ● ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

কলাপাড়া পৌরসভার পানিসেবায় নাগরিক ভোগান্তি, পাম্প নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভায় পানির সংকটে নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়েছে। পৌরসভার এতিমখানা এলাকার সদ্য নির্মিত একটি পানির পাম্প হাউস চালুর পর পানি ও বালু ওঠায় সেটি বন্ধ রয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ, পাম্পটি নির্মাণে অনিয়মের পাশাপাশি পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা।

 

পাম্পটি চালু করে প্রায় ৫৭ লাখ লিটার পানি উত্তোলনের পর পানির সঙ্গে অনবরত বালু ওঠায় পৌর কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ রাখে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

এ ঘটনায় নাগরিকদের লিখিত অভিযোগের পর পৌরসভা প্রশাসক সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে কমিটি প্রতিবেদন দিলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নাগরিকরা।

 

পৌরসভা সূত্র জানায়, ‘ক’ শ্রেণির কলাপাড়া পৌরসভায় পানির গ্রাহক রয়েছেন ৪ হাজার ৮৬০ জন। পানি শাখায় দুটি জেনারেটর থাকলেও ক্রয়ে অনিয়মের কারণে সেগুলো প্রায়ই বিকল থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে ওভারহেড ট্যাংকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হয় না।

 

পৌরসভায় ৫ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি ওভারহেড ট্যাংক রয়েছে। চারটি পাম্প হাউসের মধ্যে একটি বালু ওঠার কারণে বন্ধ। অথচ ২৪ ঘণ্টায় পৌরবাসীর পানির চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ লিটার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলে ১৫ থেকে ২০ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করা সম্ভব হলেও বিদ্যুৎ না থাকলে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে অজু, গোসল, রান্নাসহ গৃহস্থালি কাজে ভোগান্তিতে পড়ছেন নাগরিকরা।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পৌরসভার তহবিল থেকে ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি জেনারেটর কেনা হয়। অপরটি সিটিআইইপি প্রকল্পের মাধ্যমে পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, কাগজপত্রে নতুন জেনারেটর কেনার বিল-ভাউচার দেখানো হলেও বাস্তবে স্বল্পমূল্যে পুরোনো জেনারেটর কেনা হয়। কেনার কিছুদিন পরই সেগুলো বিকল হয়ে পড়ে। এরপর জেনারেটর মেরামতের নামে প্রায়ই বিল-ভাউচার উত্তোলন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

পৌরসভার বিভিন্ন নির্মাণকাজে প্রকৌশল শাখার যথাযথ তদারকি না থাকায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া ইজিপি টেন্ডারে কাজ পাওয়ার পর বাস্তবে অন্যদের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

এতিমখানা এলাকার পানির পাম্প হাউসটির নির্মাণ নিয়েও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, নকশা অনুযায়ী কাজ না করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ইউপিভিসি পাইপে কেচিং দেওয়া হয়নি। মূল পাইপের সঙ্গে ৬ ইঞ্চি সংযোগ পাইপ সড়কের এক মিটার নিচে স্থাপনের কথা থাকলেও তা মাত্র ১০ সেন্টিমিটার নিচে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ১ হাজার ৩০ থেকে ১ হাজার ১৩০ পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশে ব্যবহৃত ফিল্টারও নিম্নমানের বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া ছেঁড়া তার দিয়ে পানির মোটরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

পাম্পটি চালু করতে গিয়ে পৌরসভার পানি শাখার কর্মী মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হন বলে জানা গেছে। পরে তাঁর চিকিৎসার ব্যয় পৌরসভাকে বহন করতে হয়।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের দাবি, ইজিপি টেন্ডারে এতিমখানা এলাকার পানির পাম্প নির্মাণের কাজ পায় বরগুনার কামাল এন্টারপ্রাইজ। তবে বাস্তবে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কাজটি বাস্তবায়ন করেন। তাদের সঙ্গে সদ্য বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমানের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলেও দাবি করেন ওই সূত্র। নির্মাণকাজের ত্রুটি নিয়ে পানি শাখার কারিগরি কর্মীরা কথা বললে তাদের শাস্তিমূলক বদলির হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মশিউর রহমান। বর্তমানে বরগুনার পাথরঘাটা পৌরসভায় কর্মরত এই প্রকৌশলী বলেন, পানির পাম্পটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না, এমন তথ্যও তিনি জানেন না।

 

ওই সূত্র আরও দাবি করেন, আমতলী পৌরসভায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে নির্মাণকাজের অনিয়মের প্রতিবাদকারী এক সাংবাদিকের জামার কলার ধরে মশিউর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিলেন। এছাড়া কলাপাড়া ছাড়ার আগে কাজল মৃধা নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ২০ হাজার টাকা উৎকোচ ফেরত দিতে তিনি বাধ্য হন বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে মশিউর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নাগরিক এবং সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্য মো. আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘পৌরসভার সদ্য নির্মিত পানির পাম্প হাউসটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়নি। নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে। ফলে এটি নাগরিকদের কোনো কাজে আসছে না।’

 

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল খান বলেন, ‘পাম্প হাউসটি আমার লাইসেন্সে ওরা ৪-৫ জন করেছে। যেহেতু কাগজে-কলমে এটি আমি করেছি, তাই এর দায়ভার আমাকেই নিতে হবে। আমার টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা এটি সচল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

 

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মজিবুল হায়দার বলেন, ‘এটি আমার যোগদানের আগে নির্মাণ করা হয়েছে। অফিস ডকুমেন্ট অনুযায়ী কাজটি করেছে কামাল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি তাদের অবগত করা হয়েছে। তাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এসে এটি সচল করে দেবে। তারা ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

কলাপাড়া পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘পাম্প হাউস নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা বালু ওঠা বন্ধ করে এটি সচল করার পদক্ষেপ নেবে। তাদের এক বছরের মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব রয়েছে। এছাড়া তাদের জামানতের টাকা জমা আছে।’

বাংলাদেশ সময়: ১৯:০৭:৪০ ● ১৮ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ