
নাসির উদ্দিন বিপ্লব
মাসখানেক আগে হঠাৎ ফোন করেছিলেন পুলক দা। বললেন, স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে কুয়াকাটায় আসবেন। কোথায় থাকবেন, কোন হোটেল ভালো হবে, এমনকি খুব ভালো কোনো হোটেলেরও প্রয়োজন নেই, সাধারণ কোনো হোটেল হলেই হবে- এসব নিয়ে কথা হলো।
আমি বলেছিলাম, ‘আপনি সময় করে আসেন। কুয়াকাটায় আসার পর সব দায়-দায়িত্ব আমার।’
ওপাশ থেকে পুলক দা বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, দেখি।’
সেই ‘দেখি’ আর হয়ে ওঠেনি। কুয়াকাটায়ও আসা হলো না তাঁর।
পুলক দার সাথে ফোনে সেই কথোপকথনটিই এখন শেষ স্মৃতি হয়ে আছে।
১৯৯৭ সালের কথা। বরিশাল শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের বার্তা পত্রিকায় তখন তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা। ওই পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক ছিলেন তৌফিক আজাদ মারুফ, বর্তমানে তিনি রয়েছেন অস্ট্রেলিয়া। কলাপাড়ার সাংবাদিক শাহজাহান সীরাজের হাত ধরে গিয়েছিলাম আজকের বার্তায়।
সাংবাদিকতার খাতায় তখন আমার একেবারেই শুরুর দিকের সময়। কুয়াকাটা-মহিপুর থেকে খবর পাঠাতাম ডাকযোগে। বয়সে তরুণ, অভিজ্ঞতাও কম। আজকের বার্তার বরিশাল অফিসে গেলে পুলক দার সঙ্গে দেখা ও কথা হতো।
পুলক দা তখন রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি সাব-এডিটিংয়ের কাজও করতেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত। কখনো অফিস থেকে বের করে নিয়ে যেতেন চায়ের দোকানে। চা খেতে খেতে নানা কথা বলতেন। কুয়াকাটার প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংবাদিকতা, খবর, জীবনাচার- কত বিষয়েই না কথা হতো।
মফস্বল সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলো খুব সহজ ছিল না। বরিশাল শহরে এলে কখনো ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হয়েছে, কখনো ঢাকায় যাওয়ার জন্য লঞ্চের কেবিনের টিকিট নিয়ে ঝামেলায় পড়েছি। পুলক দা নিজের মতো করে এসব বিষয়ে সহযোগিতা করতেন। কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছিল না। প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোটা যেন তাঁর স্বভাবেরই অংশ ছিল।
এমনও হয়েছে, শুধু ডাক্তারের সিরিয়াল নিশ্চিত করেই থেমে থাকেননি। সরাসরি ডাক্তারের চেম্বারে হাজির হয়ে আমার বউ-বাচ্চাকে ডাক্তার দেখিয়ে দিয়েছেন। তখন হয়তো এসবকে খুব বড় কিছু মনে হয়নি। কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন ছোট ছোট ঘটনাই আসলে মানুষকে মানুষের কাছে বড় করে তোলে।
আমার মামাতো ভাই খান এ রাজ্জাকও সাংবাদিকতায় এসেছিলেন পুলক দার হাত ধরে। কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাজ্জাক আমার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তিনি দৈনিক সমকালেও কাজ করেছেন। সে সময় সমকালে পুলক চ্যাটার্জীর বেশ গুরুত্বও ছিল। রাজ্জাকের সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে তাঁর সহযোগিতার কথা তাই আলাদাভাবেই মনে পড়ে।
পুলক দার সঙ্গে আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল জায়গাগুলোর একটি কুয়াকাটার আলীপুরে আমার বাড়িতে।
এক রাতে হঠাৎ কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে আমার বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন দৈনিক সমকালের সাবেক এই ব্যুরো প্রধান। সেদিনের সেই হঠাৎ আসা দলে যতদূর মনে পড়ে, ছিলেন ইত্তেফাকের প্রয়াত সাংবাদিক লিটন বাশার, বরিশাল প্রেসক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন এবং আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও অভিভাবক দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরো প্রধান আকতার ফারুক শাহিন।
কেউ আগে থেকে আসার খবর দেননি। হঠাৎ করেই সবাই চলে এসেছিলেন। আমার মা তখন যা ছিল, তাই দিয়ে রান্না করলেন। সাদা ভাতের সঙ্গে রান্না হয়েছিল সাগরের একটি মাছ।
সেদিনের সেই সাধারণ খাবারটিও পুলক দার মনে জায়গা করে নিয়েছিল। পরে মাঝেমধ্যে ফোন করে সেই মাছের কথা মনে করিয়ে দিতেন।
আমার সাংবাদিকতা জীবনের পথটাও এর মধ্যে অনেকটা দীর্ঘ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে আজকের বার্তা দিয়ে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছি। ২০০৫ সাল থেকে দৈনিক যুগান্তরে প্রিয় আকতার ফারুক শাহিন ভাইর হয়ে কুয়াকাটা থেকে সাংবাদিকতা করছি।
এই দীর্ঘ সময়ে একে একে হারিয়েছি অনেক সহকর্মী ও প্রিয় মানুষকে। আজকের বার্তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল, তখনকার আমার দেশের ব্যুরো প্রধান জিএম বাবর আলী, দৈনিক আজকের বার্তার বার্তা সম্পাদক মুনীর হোসেন, আজকের বার্তার বার্তা সম্পাদক মিন্টু বসু ও ইত্তেফাকের বরিশাল ব্যুরো প্রধান লিটন বাশার কিংবা কুয়াকাটার সাংবাদিক খান এ রাজ্জাক- আরও কতজন।
সহকর্মীদের চলে যাওয়ার খবর এখন আর শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ মনে হয় না। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে নিজের সাংবাদিকতা জীবনের একটি করে স্মৃতিও হারিয়ে যায়। মনে হয়- ক্রমে ছোট হয়ে আসছে আমার পৃথিবী।
পুলক চ্যাটার্জীর চলে যাওয়ার খবরটিও তেমনই।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে অবস্থিত দৈনিক সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয়ে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় কয়েকটি সুইসাইড নোট উদ্ধারের কথাও জানা গেছে।
তবে পুলক দার মতো একজন সাংবাদিকের চলে যাওয়ার পর কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমরা কি মানুষকে শুধু চলে যাওয়ার পরই মনে করি? জীবিত অবস্থায় একজন সহকর্মীর প্রয়োজন, অসহায়ত্ব কিংবা নীরব কষ্ট কতটা দেখতে পাই?
মফস্বলের সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলে। চাকরির নিশ্চয়তা কম, আয় সীমিত, কাজের চাপ আছে, আবার অনেক সময় দীর্ঘদিন কাজ করার পরও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। এই বাস্তবতার মধ্যেই আমরা কাজ করে যাই।
তাঁকে নিয়ে আজ অনেকেই লিখছেন। স্মৃতিচারণ করছেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা মনে করছেন। আমিও করছি।
কিন্তু আমার কাছে পুলক দা কোনো বড় পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকা একজন মানুষ নন। তিনি ছিলেন অতি সাধারণদের একজন, অথচ সেই সাধারণ মানুষটিই আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবেন।
আমাদের পুলক দা।