
সাগরকন্যা বিনোদন ডেস্ক
ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় কাটাতে বন্ধুর পরামর্শে নাটকের দলে যোগ দিয়েছিলেন স্বর্ণালী চৈতী। তখন অভিনয় নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবে মঞ্চে কাজ করতে করতেই অভিনয়ের প্রতি তৈরি হয় ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই শুরু নতুন স্বপ্নের পথচলা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে থিয়েটার থেকে সিনেমায় জায়গা করে নিয়েছেন এই তরুণ অভিনেত্রী।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ার সময় শিক্ষক ও অভিনেতা শরীফ সিরাজের তত্ত্বাবধানে একবার অভিনয়ের অভিজ্ঞতা হয়েছিল চৈতীর। এরপর ব্যক্তিগত কারণে মন ভালো না থাকায় বন্ধু মহুয়ার সঙ্গে নাট্যদল তাড়ুয়ার কার্যক্রমে যুক্ত হন। শুরুতে সময় কাটানো ও মন ভালো রাখাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে অভিনয়ের জগৎ তাঁকে টানতে শুরু করে।
চৈতী বলেন, ‘শুরুর দিকে থিয়েটারের মৌলিক বিষয়গুলোও জানতাম না। খারাপ সময় পেছনে ফেলে একটু আনন্দ পাওয়ার জন্যই যেতাম। পরিচালক যখন কোনো চরিত্র দিতেন, তখন সেটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজেকে কল্পনায় পর্দায় দেখতে পেতাম। সেখান থেকেই সিনেমায় কাজ করার ইচ্ছা তৈরি হয়।’
অভিনয়ের আগ্রহের কথা নাট্যদলের সদস্য বাকার বকুলকে জানালে তিনি চৈতীকে প্রাচ্যনাট অ্যাক্টিং স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন অডিশনের খবরও জানাতে থাকেন। সেখান থেকেই মূলত পেশাদার অভিনয়ের পথে যাত্রা শুরু।
চৈতীর প্রথম সিনেমা রতন পালের ‘অন্তরখোলা’। সরকারি অনুদান পাওয়া সিনেমাটির অডিশনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। সিনেমাটির নিয়মিত কর্মশালার পাশাপাশি প্রাচ্যনাট অ্যাক্টিং স্কুলে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে আবারও তাড়ুয়ায় ফিরে মঞ্চনাটকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দলটির হয়ে ‘আদম সুরত’, ‘লেট মি আউট’সহ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।
এরপর ওয়াহিদ তারেক ও ইমতিয়াজ সজীবের একটি প্রকল্পে কাজের সুযোগ পান। শুটিং ও ডাবিংয়ের সূত্রে পরিচিতি বাড়তে থাকে। পাশাপাশি কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেন। পরে নূর ইমরান মিঠুর ‘কুরকাব’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান।
‘কুরকাব’-এর শুটিং শেষ হওয়ার পর এন রাশেদ চৌধুরীর ‘সখী রঙ্গমালা’ সিনেমার অডিশনের ডাক পান চৈতী। সেখানে ফুলেশ্বরী চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত হন। এরপর আসে রায়হান রাফীর হরর সিনেমা ‘আন্ধার’-এ অভিনয়ের সুযোগ।
এই সিনেমায় আফসানা মিমি, চঞ্চল চৌধুরী, সিয়াম আহমেদ, নাজিফা তুষিসহ পরিচিত শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে কিছুটা সংশয়ে ছিলেন তিনি। তবে পরিচালকের উৎসাহ ও সহশিল্পীদের সহযোগিতায় আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজটি শেষ করেন।
চৈতী বলেন, ‘চঞ্চল ভাই, তুষি আপুসহ সিনিয়র শিল্পীরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। আমার নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য তাঁরা মজা করতেন, কথা বলতেন। এসব অভিজ্ঞতা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।’
তবে হরর সিনেমায় সবাইকে ভয় দেখানোর চরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তবে সেটের সবচেয়ে ভীতু মানুষদের একজন ছিলেন তিনি- এমন মজার তথ্যও জানিয়েছেন চৈতী।
চারটি সিনেমার কাজ শেষ করে এবার তিনি ব্যস্ত হচ্ছেন স্বপন আহমেদের ‘দ্য অরেঞ্জ’ সিনেমার প্রস্তুতিতে। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিতব্য সিনেমাটির বাংলা নাম ‘পথের বন্ধু’। এতে আরও অভিনয় করছেন তৌকীর আহমেদ ও ফয়জুল ইয়ামিন।
সিনেমাটির গল্প একজন বাংলাদেশি প্রবাসীকে ঘিরে, যিনি ফ্রান্সে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। বহু বছর পর হারিয়ে যাওয়া বাবার সন্ধানে ফ্রান্সে যান তাঁর মেয়ে। সেই অনুসন্ধান ও বাবা-মেয়ের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে গল্প। আগামী মাসে চৈতীর অংশের শুটিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অবসরে সিনেমা বা সিরিজ দেখার চেয়ে বই পড়তেই বেশি পছন্দ করেন চৈতী। তবে চরিত্রের প্রস্তুতির প্রয়োজন হলে সিনেমা দেখেন নিয়মিত। ‘দ্য অরেঞ্জ’-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বর্তমানে তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’ দেখছেন।
অভিনয়ের প্রস্তুতিতে তাঁর বিশেষ অনুপ্রেরণা হলেন হলিউড অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ। কোনো দৃশ্যের আগে মাঝেমধ্যে তাঁর অভিনীত সিনেমার দৃশ্য দেখেন বলেও জানিয়েছেন চৈতী।
বর্তমানে অরুন্ধতী রায়ের আত্মজীবনীমূলক বই ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ পড়ছেন তিনি। লেখকের অকপট আত্মপ্রকাশ তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে বইটি নিয়ে সিনেমা নির্মিত হলে পর্দায় অরুন্ধতী রায়ের চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বড় কোনো পরিকল্পনা নেই স্বর্ণালী চৈতীর। ছোট ছোট পদক্ষেপে নিজের পছন্দের কাজ করে এগিয়ে যেতে চান তিনি। সিনেমায় ব্যস্ততা বাড়লেও মঞ্চ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই তাঁর। কারণ মন খারাপ ভুলতে যে মঞ্চে এসেছিলেন, সেই মঞ্চই তাঁকে দেখিয়েছে নতুন স্বপ্নের পথ।