মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত

হোম » খুলনা » মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত
শনিবার ● ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বেনাপোল

 

যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হয়েছে।

 

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী কাশিপুরে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের রণাঙ্গন-সমাধিতে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এ সময় বিজিবির একটি সুসজ্জিত দল তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করে।

 

পরে যশোর ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর নূর উদ্দিন আহমাদ বীরশ্রেষ্ঠের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিজিবির সহকারী পরিচালক মাছেদুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মার মাগফিরাত কামনায় ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও উপস্থিত সবার মধ্যে তবারক বিতরণ করা হয়।

 

অনুষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।

 

যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও পরিচালক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মত্যাগ ও অসামান্য বীরত্ব জাতির জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই প্রতিবছরের মতো এবারও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি পালন করা হয়েছে।

 

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার সীমান্তবর্তী ছুটিপুর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছে গোয়ালহাটি এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন নূর মোহাম্মদ শেখ। সেদিন চারজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে তিনি একটি টহল দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু করে।

 

যুদ্ধের সময় সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হলে নূর মোহাম্মদ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে যান। এক হাতে অস্ত্র চালিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে করতে অন্য হাতে আহত সহযোদ্ধাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

 

এ সময় শত্রুর মর্টারের গোলায় তাঁর হাঁটু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডান কাঁধেও গুলি লাগে। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থাতেও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। পরে অপর সহযোদ্ধাকে আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

 

সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে নূর মোহাম্মদ একাই শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একটি গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে তিনি অনবরত গুলি চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখেন। একপর্যায়ে রণাঙ্গনেই শাহাদাত বরণ করেন এই বীর সেনানী।

 

পরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরপর একটি ঝোপের আড়াল থেকে নূর মোহাম্মদ শেখের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁকে শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

 

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার বর্তমান নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আমানত শেখ ও মা জেন্নাতুন্নেসা। শৈশবেই বাবা-মাকে হারিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এতিম হয়ে পড়েন তিনি।

 

জীবিকার প্রয়োজনে প্রথমে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেন নূর মোহাম্মদ। পরে ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। সৈনিক জীবনে সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য তিনি সহকর্মীদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

 

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘তকমা-ই-জং’ ও ‘সিতারা-ই-হারব’ পদকে ভূষিত হন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর পেয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরবর্তীতে ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন বয়রা সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে একাধিক অভিযানে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন।

 

সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করা নূর মোহাম্মদ শেখের অতুলনীয় বীরত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে। আজও তাঁর আত্মত্যাগ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঙালি জাতির সাহস ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

বাংলাদেশ সময়: ২২:৫৫:২৬ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ