পর্যটনের আড়ালে কুয়াকাটার মানুষের জীবন

হোম » ফিচার » পর্যটনের আড়ালে কুয়াকাটার মানুষের জীবন
শনিবার ● ২২ আগস্ট ২০২৬


 

কুয়াকাটার আলীপুর মৎস্য বন্দরে এমনই দৈনন্দিন চিত্র। ছবিটি আলীপুর বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের। সংগৃহীত ছবি

নাসির উদ্দিন বিপ্লব

সকালের সূর্য তখনও পুরোপুরি মাথার ওপরে ওঠেনি। কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা ধীরে ধীরে বাড়ছে। কেউ সূর্যোদয়ের ছবি তুলছেন, কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ে পা ভেজাচ্ছেন। সৈকতের এক পাশে চায়ের দোকানে ব্যস্ততা, অন্য পাশে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার চালকদের ডাকাডাকি। পর্যটকের চোখে এটাই কুয়াকাটা- সমুদ্র, বালুচর আর ছুটির আনন্দ।

কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালেই শুরু হয়ে যায় আরেক কুয়াকাটার দিন। যে কুয়াকাটায় সমুদ্র শুধু সৌন্দর্যের নয়, জীবিকারও নাম। কারও সংসার চলে মাছ ধরে, কারও পর্যটকদের কাছে চা-বিস্কুট বিক্রি করে, কেউ সৈকতে ছবি তুলে, কেউ অটোরিকশা চালিয়ে কিংবা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে পর্যটকদের ঘুরিয়ে। আবার কেউ কাজ করেন হোটেল-রেস্তোরাঁয়।

পর্যটননির্ভর এই জনপদের মানুষের জীবন তাই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই- কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল।

পর্যটক আসার আগেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ

কুয়াকাটার অনেক মানুষের দিন শুরু হয় পর্যটক জেগে ওঠার আগেই। দিনের আলো না ফুটতেই কেউ অটোরিকশা নিয়ে অভিজাত আবাসিক হোটেলগুলোর সামনে, আবার কেউ ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে পর্যটকদের সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাতে ব্যস্ত। কেউ ছুটছেন মাছের ঘাটে, কেউ খুলছেন দোকান। হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েন নতুন দিনের প্রস্তুতিতে।

কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টের চা বিক্রেতা আয়নালের বক্তব্যে ফুটে ওঠে সেই বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘পর্যটক বেশি এলে আমাদের আয় বাড়ে। আবার পর্যটক কম থাকলে দোকানে বসে থাকা ছাড়া কোনো ব্যস্ততাই থাকে না। তাই আমাদের আয়টা মূলত মানুষের ভ্রমণের ওপর নির্ভর করে।’

কুয়াকাটার ছোট ব্যবসাগুলোর বড় অংশই মৌসুমি। ছুটির দিন, সরকারি লম্বা ছুটি কিংবা ঈদসহ বিশেষ উৎসবের সময় বিক্রি বাড়ে। অন্য সময়ে অনেক ব্যবসায়ীকে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী পর্যটন মৌসুমের জন্য।

সমুদ্রই কারও জীবিকা, কারও অনিশ্চয়তা

কুয়াকাটার জীবনকে সমুদ্র থেকে আলাদা করা কঠিন। এখানকার জেলে পরিবারগুলোর কাছে সমুদ্র মানে প্রতিদিনের রোজগার। ভোরে কিংবা রাতে নৌকা নিয়ে সমুদ্রে যাওয়া, মাছ ধরে ফেরা, ঘাটে মাছ বিক্রি- এই চক্রের মধ্যেই কেটে যায় তাদের জীবন।

কিন্তু এই জীবিকার সঙ্গে রয়েছে অনিশ্চয়তাও। আবহাওয়া খারাপ হলে উত্তাল সমুদ্রে নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় না। কখনো মাছ কম পাওয়া যায়, কখনো ঝড়ের আশঙ্কায় নৌকা তীরে ফিরিয়ে আনতে হয়।

কুয়াকাটার পাঞ্জুপাড়ার জেলে আনোয়ারের ভাষ্য, ‘সমুদ্রের আয় থেকেই আমাদের খাওয়া হয়, আবার সমুদ্রকেই ভয়ও পাই। আবহাওয়া খারাপ হলে চিন্তা হয় নৌকা আর মানুষ নিরাপদে ফিরবে কি না। তারপরও সমুদ্র ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।’

এই নির্ভরতার মধ্যেই জেলে পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে।

পর্যটন বদলে দিয়েছে জীবিকার ধরন

একসময় কুয়াকাটার মানুষের প্রধান পরিচয় ছিল কৃষক, জেলে বা স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। এখন অনেক তরুণ ভাড়ায় মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশা চালান, পর্যটকদের ঘোরান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় চাকরি করেন কিংবা সৈকতকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত।

কেউ আবার পর্যটকদের জন্য ছবি তোলেন। কেউ ভাড়ায় যানবাহন দেন। কেউ সমুদ্রসৈকতে খাবার বিক্রি করেন।

স্থানীয় তরুণ আক্কাস বলেন, ‘আগে বাইরে কাজ খুঁজতে যেতে হতো। এখন কুয়াকাটায় পর্যটক এলে এখানেই কাজ পাওয়া যায়। তবে পর্যটক না থাকলে আয়ও কমে যায়।’

এই পরিবর্তন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মানুষের আয়ের ওপর পর্যটন মৌসুমের নির্ভরতাও বাড়িয়েছে।

রাখাইন পল্লিতে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার লড়াই

কুয়াকাটার পরিচয়ের সঙ্গে রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাদের পোশাক, তাঁত, খাবার, উৎসব ও জীবনযাপন এই জনপদের সংস্কৃতিকে বৈচিত্র্যময় করেছে।

পর্যটকেরা কুয়াকাটায় এসে শুধু সমুদ্র দেখতে চান না; স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাপন দেখতেও আগ্রহী। ফলে রাখাইন নারীদের হাতে তৈরি পোশাক ও বিভিন্ন পণ্য পর্যটন অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে আধুনিকতার দ্রুত বিস্তারে ঐতিহ্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে পুরোনো কারুশিল্প ও জীবনধারার কিছু অংশ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পর্যটনের সঙ্গে এসেছে পরিবর্তন

কুয়াকাটায় পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে স্থানীয় জীবনযাত্রাও। একসময় যেখানে খালি জায়গা, কৃষিজমি কিংবা ছোট ছোট বসতি ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।

জমির মূল্য বেড়েছে। ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার জমি বা সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধির সুবিধা পেয়েছে। আবার একই সঙ্গে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, পর্যটন তাদের জীবনকে সহজ করেছে। আবার কারও কাছে এটি নিয়ে এসেছে বাড়তি চাপ।

কুয়াকাটার নবীনপুরের নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘কুয়াকাটা এখন আগের মতো নেই। মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু খরচও বেড়েছে। আমাদের সন্তানরা এখন অন্যভাবে ভবিষ্যৎ দেখতে শেখে।’

সমুদ্রের সৌন্দর্যের নিচে পরিবেশের সংকট

কুয়াকাটার সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ সমুদ্র। কিন্তু সেই সমুদ্রই স্থানীয় মানুষের জন্য নানা সংকটও বয়ে আনে। ঘূর্ণিঝড়, ভাঙন, লবণাক্ততা ও আবহাওয়ার পরিবর্তন এখানকার জীবনকে প্রভাবিত করে।

প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে হয় উপকূলের নিম্নআয়ের মানুষকে। একটি ঝড় তাদের কয়েক মাসের আয় কেড়ে নিতে পারে। একটি ভাঙন বদলে দিতে পারে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যবসার জায়গা।

তাই পর্যটকের চোখে যে সমুদ্র অপরূপ, স্থানীয় মানুষের চোখে সেই সমুদ্র একই সঙ্গে সৌন্দর্য, জীবিকা ও ঝুঁকির প্রতীক।

ছুটির দিনের কুয়াকাটা আর অন্য দিনের কুয়াকাটা

ছুটির দিনগুলোতে কুয়াকাটা যেন অন্য এক শহর। সৈকতে মানুষের ঢল নামে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের ব্যস্ততা বাড়ে। দোকানিদের বিক্রি বেড়ে যায়।

কিন্তু পর্যটকের ভিড় চলে গেলে কুয়াকাটা আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যায়। সৈকত ফাঁকা হয়। ব্যবসায়ীরা হিসাব মেলান। জেলেরা আবার সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। স্থানীয় পরিবারগুলো ফিরে যায় তাদের প্রতিদিনের জীবনে।

এই দুই কুয়াকাটার মধ্যে পার্থক্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- একটি কুয়াকাটা পর্যটকের, অন্যটি স্থানীয় মানুষের।

পর্যটনের ভবিষ্যৎ মানেই স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যৎ

কুয়াকাটার পর্যটন যত বাড়বে, স্থানীয় মানুষের জীবনে তার প্রভাবও তত বাড়বে। তাই পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনায় শুধু নতুন হোটেল, রাস্তা কিংবা অবকাঠামো নয়; স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থানীয় মানুষ যেন পর্যটনের দর্শক না হয়ে এর প্রকৃত অংশীদার হতে পারেন- এটাই হওয়া উচিত উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য।

কারণ কুয়াকাটার আসল সৌন্দর্য শুধু সমুদ্রের ঢেউ কিংবা সূর্যোদয়-সূর্যাস্তে নয়। এই সৌন্দর্যের বড় অংশজুড়ে আছে ভোরে সমুদ্রে যাওয়া জেলে, পর্যটকের অপেক্ষায় থাকা চা বিক্রেতা, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশা চালানো তরুণ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই উপকূলে বসবাস করা সাধারণ মানুষ।

পর্যটক কয়েক দিনের জন্য কুয়াকাটায় আসেন। ছবি তোলেন, সমুদ্র দেখেন, ফিরে যান। কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে কুয়াকাটা কোনো ভ্রমণস্থল নয়- এটাই তাদের ঘর, জীবিকা, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ।

লেখক: কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি

বাংলাদেশ সময়: ১০:২২:৪৬ ● ৩৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ