ভাণ্ডারিয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

হোম » লিড নিউজ » ভাণ্ডারিয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
মঙ্গলবার ● ১৮ আগস্ট ২০২৬


 

ভাণ্ডারিয়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর

 

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিবহির্ভূত নথি ও রেজুলেশন তৈরি, শিক্ষকদের মানসিক হয়রানি এবং নারী শিক্ষককে প্রকাশ্যে কটূক্তিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসান সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পরে অভিযোগগুলো অধিকতর তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

একাধিক সহকারী শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পর ইউএনও বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করেন। অভিযোগকারীরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে ধরেন।

 

নারী শিক্ষক সেলিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক তাকে প্রকাশ্যে পোশাক নিয়ে কটূক্তি করার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে মানসিক হয়রানি করেছেন। তার অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখারও অভিযোগ করেন তিনি। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে তিনি আর্থিক ও মানসিক সমস্যায় রয়েছেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতে খরচের যথাযথ রশিদ ও ভাউচার ছাড়াই বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তারও যথাযথ হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

 

এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো শিক্ষক স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা এবং সামাজিকভাবে অপপ্রচার চালানোরও অভিযোগ করেছেন তারা।

 

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া রেজুলেশন ও বিভিন্ন নথি তৈরি করে শিক্ষকদের হয়রানি করা হয়েছে। শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের কাছ থেকেও হুমকি-ধামকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলমের স্বাক্ষর জাল করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রায় পাঁচ মাস বিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং বেতন-ভাতা বন্ধ রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে।

 

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ফারজানা আক্তার নিপা নামের এক নারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করা হয় এবং ওই কোচিং কার্যক্রম থেকে প্রধান শিক্ষক কমিশন নিতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা একটি মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী শিক্ষকদের দাবি, ওই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা অধিকতর তদন্তে যাচাই করা হবে।

 

বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের দাবি, প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য উৎস থেকে জমা হওয়া অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজ বাসায় নিয়ে যান। পরে নিজের সুবিধামতো ভাউচার তৈরি করে সহকারী শিক্ষকদের দিয়ে তাতে স্বাক্ষর করানো হয়। স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে বেতন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

 

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিদ্যালয়ের অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে না রেখে প্রধান শিক্ষক নিজের একক নামে ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ জমা ও উত্তোলন করেছেন। ওই হিসাবের অর্থের লেনদেন ও ব্যয়ের বিবরণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

 

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ নিয়েও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, টেস্ট পরীক্ষায় পাঁচ, ছয় বা সাত বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

 

শিক্ষার্থীদের টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি ও আদায়ের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। একই সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং করানোর নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় এবং কোচিংয়ে যুক্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে।

 

বিদ্যালয়ের সংস্কার, প্রচার ও অন্যান্য কাজের কথা বলে শিক্ষকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থের যথাযথ হিসাব বা ব্যবহার দেখানো হয়নি বলে দাবি শিক্ষকদের। এ ছাড়া তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সহকারী শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

 

শিক্ষকদের দাবি, এসব অভিযোগিত অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একাধিক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক এস.এম. মজিবুর রহমান তদন্তকালে অভিযোগগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে প্রধান শিক্ষক অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা প্রশাসনিক তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন তদন্তকালে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

তিনি জানান, তদন্ত কমিটি অভিযোগগুলোর বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৪২:০৩ ● ২৩ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ