
মেজবাহউদ্দিন মাননু
কুয়াকাটা যাওয়ার পথে এবার গন্তব্যের পাশাপাশি উপভোগ করা যেতে পারে পুরো যাত্রাটিও। কলাপাড়া শহর থেকে বিকল্প পথে বালিয়াতলী ও গঙ্গামতি হয়ে কুয়াকাটায় গেলে একদিকে যেমন যানজট এড়িয়ে তুলনামূলক নিরিবিলি সড়কে চলা যায়, অন্যদিকে পথে পাওয়া যায় গঙ্গামতি সৈকত, ঝাউবাগান, চরাঞ্চল ও উপকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সবচেয়ে বড় সুবিধা, এ পথে সেতুর টোল দিতে হয় না।
প্রচলিত সড়কের তুলনায় বিকল্প পথটি প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার বেশি। তবে প্রায় দেড় বছর আগে সংস্কারের পর সড়কটি এখন বেশ মসৃণ। যানবাহনের চাপও তুলনামূলক কম। ফলে কুয়াকাটাগামী পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে ভিন্ন অভিজ্ঞতার একটি পথ।
কলাপাড়া পৌরশহর থেকে প্রচলিত পথে কুয়াকাটায় যেতে কয়েকটি সেতুতে টোল দিতে হয়। বিকল্প হিসেবে নাচনাপাড়া চৌরাস্তা হয়ে বালিয়াতলী-গঙ্গামতি সড়ক ব্যবহার করা যায়। এ পথে এলজিইডির নির্মিত আন্ধারমানিক নদীর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সড়ক ধরে গঙ্গামতি হয়ে কুয়াকাটায় যাওয়া যায়।
তবে এই পথের বিশেষ আকর্ষণ গঙ্গামতি সৈকত।
প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত বেলাভূমি, ঝাউবাগান ও উপকূলীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ। জোয়ার-ভাটার সময় সৈকতের দৃশ্যও বদলে যায়। তুলনামূলক কম কোলাহলের কারণে এখানে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তও দেখা যায়।
গঙ্গামতির চরাঞ্চলে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মোটরসাইকেলে অল্প সময়ে কাউয়ার চর এলাকায়ও যাওয়া যায়। স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি এখন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয় জেলে কামাল হোসেন বলেন, গঙ্গামতির চর দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের গাছপালাও।
সৈকতের পাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ছোট দোকান ও খাবারের ব্যবস্থা। ভোরের খিচুড়ির জন্য একটি এলাকা ‘খিচুড়ি পয়েন্ট’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। সেখানে ডাব, চা-কফি ও খাবারের দোকান রয়েছে। তবে কুয়াকাটা সৈকতের মতো এখানে এখনো পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় নেই।
গঙ্গামতি ঘুরে পর্যটকেরা যেতে পারেন মিশ্রিপাড়া রাখাইন পল্লীতে। সেখানে রয়েছে সীমা বৌদ্ধবিহার। বিহারের ভেতরে রয়েছে প্রায় শত বছরের পুরোনো গৌতম বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি। মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৩২ ফুট। রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন এটিকে এশিয়ার অন্যতম বড় বুদ্ধমূর্তি বলে দাবি করেন।
বৌদ্ধবিহারের পাশেই রয়েছে রাখাইন মার্কেট। সেখানে রাখাইনদের তৈরি পোশাক ও বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যায়। রয়েছে রাখাইন জাদুঘরও। বিহারাধ্যক্ষ উত্তম ভান্তে জানান, বৌদ্ধবিহারটির শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গঙ্গামতি এলাকায় রাতযাপনের জন্য রয়েছে রিসোর্ট ও কটেজ। পাশাপাশি ধোলাইর বাজারে সারা দিনই সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। তুলনামূলক কম খরচে তাজা মাছের খাবারও খাওয়ার সুযোগ রয়েছে সেখানে।
বিকল্প সড়কটির দুই পাশে রয়েছে উপকূলীয় প্রকৃতি ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের দৃশ্য। ফলে শুধু দ্রুত কুয়াকাটায় পৌঁছানোর পরিবর্তে পর্যটকেরা চাইলে গঙ্গামতি ও আশপাশের এলাকা ঘুরে এরপর কুয়াকাটায় যেতে পারেন।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, গঙ্গামতি সৈকতে বিদ্যুৎ, শৌচাগারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৈকতের বেলাভূমিতে গাড়ি নেওয়ার সুবিধার জন্য লেকের ওপর গার্ডার সেতুও নির্মাণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কলাপাড়া থেকে গঙ্গামতি হয়ে কুয়াকাটার বিকল্প সড়কটি এখন শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নয়; কিছুটা বেশি পথ পাড়ি দিতে হলেও পথে রয়েছে সৈকত, ঝাউবাগান, চর, জেলেদের জীবন, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ম্যানগ্রোভ বন ও রাখাইন সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। তাই কুয়াকাটার ভ্রমণে এই পথটি যুক্ত করতে পারেন প্রকৃতি ও নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করা পর্যটকেরা।