
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)
ঈদুল আযহার দিন যখন চারদিকে পোলাও-মাংসের ঘ্রাণে উৎসবের আমেজ, তখন পটুয়াখালীর বাউফলের নদীবেষ্টিত মান্তা পল্লীতে দেখা গেছে ভিন্ন বাস্তবতা। উৎসবের সেই আনন্দের ভিড়ের বাইরে নৌকায় বসবাসকারী শতাধিক মান্তা পরিবার ঈদের দিনও কাটিয়েছে ডাল-ভাত আর নদীর ছোট মাছের ঝোলেই।
বৃহস্পতিবার (ঈদুল আযহার দিন) বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের বগী তুলাতলা খালে গিয়ে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া নদীর বুকে সারিবদ্ধ নৌকায় চলছে দৈনন্দিন জীবন। কোনো নৌকায় চুলায় ভাত রান্না হচ্ছে, কোথাও ডাল, আবার কোথাও নদী থেকে ধরা ছোট মাছের তরকারি ফুটছে। শিশুদের পুরোনো পোশাকেই কাটছে ঈদের দিন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শতাধিক মান্তা পরিবার বছরের পর বছর নৌকাতেই বসবাস করছে। মাছ ধরাই তাদের একমাত্র জীবিকা। মাছ মিললে সংসারে চুলা জ্বলে, না মিললে অনাহার-অর্ধাহারে কাটে দিন।
নৌকায় বসবাসকারী হোসনেয়ারা বেগম (৩৯) বলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই জেলে। কোনো জায়গা-জমি নাই। এই নৌকাতেই জীবন কাটে। কয়েকদিন ধইরা নদীতে মাছ কম পাইতেছি, তাই ঈদে বাজার করতে পারি নাই। পোলাপানরে নতুন কাপড়ও দিতে পারি নাই।
একই পেশার জেলে শহিদ সরদার বলেন,
আমাগো জন্ম নৌকাত, থাকিও নৌকাত। মাছ ধরা ছাড়া আর কিছু জানি না। মাছ পাইলে খাই, না পাইলে না খাইয়া থাকি। আমাদের ঈদ আর অন্য দিনের মধ্যে কোনো তফাত নাই।
নয় বছর বয়সী শিশু জান্নাতুলের কণ্ঠে ঈদের আলাদা আকাঙ্ক্ষা ধরা পড়ে। সে বলে,
ঈদের দিন ঘুরতে মন চায়, পোলাও-মাংস খাইতে মন চায়। কিন্তু আমাগো বাপ-মার টাকা নাই, তাই কোথাও যাইতে পারি না।
আরেক মান্তা নারী চম্পাজান বিবি সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে আক্ষেপ করে বলেন, কত মানুষ কোরবানি দেয়, ভালো-মন্দ খায়, পোলাপান আনন্দ করে। আমাদের সেই তৌফিক নাই। কেউ গোস্তও দেয় না, খবরও নেয় না। ডাল-ভাত খাইয়াই দিন যায়।
এদিকে মান্তা সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা এনজিওকর্মী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বছরের পর বছর নদীতে ভাসমান এই জনগোষ্ঠী মূলধারার উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা তাদের কাছে খুবই সীমিত। অধিকাংশ শিশুই বিদ্যালয়ের মুখ দেখে না।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলে পরিবারগুলো সরকারি সহায়তার আওতায় রয়েছে।
উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফিরোজ হাওলাদার বলেন,
যাদের জেলে কার্ড আছে তারা ভিজিএফের চাল পায়। ঈদ উপলক্ষে অনেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। তবে এর বাইরে সহায়তার সুযোগ সীমিত।
এদিকে, বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নদীতে ভাসমান মান্তা সম্প্রদায়ের জীবনে ঈদ আসে-যায়, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন খুব কমই দৃশ্যমান। পোলাও-মাংসের উৎসবের বাইরে তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা মূলত ডাল-ভাত ও জীবিকার সংগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকে।