
সাগরকন্যা ফিচার
একসময় গ্রামের হাটে দেশি মুরগিই ছিল মানুষের প্রধান পছন্দ। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে ফার্মের মুরগি। রাজধানী থেকে উপকূলের জনপদ- পটুয়াখালী, কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী, গলাচিপা কিংবা বরগুনার বাজার- সবখানেই প্রতিদিন হাজার হাজার ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে। কম দাম, সহজলভ্যতা এবং দ্রুত উৎপাদনের কারণে ফার্মের মুরগি আজ দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রাণিজ আমিষের উৎসগুলোর একটি।
তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি এই মুরগিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, ‘ফার্মের মুরগিতে হরমোন দেওয়া হয়’, ‘এটি খেলে ক্যানসার হয়’, ‘শিশুদের দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন ঘটে’ কিংবা ‘এটি একেবারেই পুষ্টিহীন’। এসব দাবির কতটা সত্য, আর কতটা গুজব? নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি জানা জরুরি।
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প: অর্থনীতির এক শক্তিশালী ভিত্তি
দেশের পোলট্রি শিল্প শুধু মানুষের খাদ্য চাহিদাই পূরণ করছে না, এটি লাখো মানুষের কর্মসংস্থানেরও উৎস। ছোট ও মাঝারি খামারের পাশাপাশি আধুনিক বাণিজ্যিক খামার গড়ে ওঠায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষির পাশাপাশি পোলট্রি খামার অনেক পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
ব্রয়লার মুরগি সাধারণত ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা যায়। ফলে দ্রুত উৎপাদন ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এই মাংস।
পুষ্টিগুণে কতটা সমৃদ্ধ?
পুষ্টিবিদদের মতে, সঠিকভাবে উৎপাদিত ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রান্না করা ফার্মের মুরগি উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম ভালো উৎস। এতে থাকে-
উচ্চমানের প্রোটিন, যা শরীরের কোষ গঠন ও মেরামতে সহায়তা করে।
ভিটামিন বি৩ (নিয়াসিন) ও বি৬, যা শক্তি উৎপাদন ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফসফরাস, যা হাড় ও দাঁতের জন্য প্রয়োজনীয়।
সেলেনিয়াম, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
জিঙ্ক ও আয়রন, যা শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
চামড়া বাদ দিয়ে খেলে চর্বির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক: সত্যিই কি হরমোন ব্যবহার করা হয়?
বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো- ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করতে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়।
বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে প্রতিটি মুরগিকে আলাদা করে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অকার্যকর। আধুনিক জাত, উন্নত খাদ্য, সুষম পুষ্টি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার কারণেই ব্রয়লার দ্রুত বেড়ে ওঠে। ফলে ‘সব ফার্মের মুরগিতে হরমোন দেওয়া হয়’- এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়।
তাহলে ঝুঁকি কোথায়?
ফার্মের মুরগি নিজে নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞরা যেসব ঝুঁকির কথা বলেন-
প্রয়োজনের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার।
নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য।
অপরিচ্ছন্ন খামার পরিবেশ।
অসুস্থ পাখি দ্রুত বাজারজাত করা।
জবাইয়ের সময় স্বাস্থ্যবিধি না মানা।
কাঁচা মাংস সংরক্ষণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অভাব।
এসব কারণে সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টর ও ই. কোলাইয়ের মতো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কেন উদ্বেগের?
বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)।
যদি খামারে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই মুরগি বাজারে বিক্রি করা হয়, তাহলে ওষুধের অবশিষ্টাংশ মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
এ কারণেই দায়িত্বশীল খামার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে গিয়ে কীভাবে ভালো মুরগি চিনবেন?
নিরাপদ মাংস কিনতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন-
মাংসের রঙ স্বাভাবিক গোলাপি বা হালকা লালচে হবে।
দুর্গন্ধ থাকা উচিত নয়।
অতিরিক্ত পিচ্ছিল বা আঠালো হবে না।
পরিষ্কার পরিবেশে জবাই করা হয়েছে কি না দেখুন।
মাছি বা ধুলাবালুতে খোলা অবস্থায় রাখা মুরগি এড়িয়ে চলুন।
বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কেনার চেষ্টা করুন।
রান্নাঘরে যেসব ভুল অনেকেই করেন
অনেকেই কাঁচা মুরগি ধোয়ার সময় রান্নাঘরের চারপাশে জীবাণু ছড়িয়ে ফেলেন।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-
কাঁচা মাংস স্পর্শের পর ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা উচিত।
মাংস সম্পূর্ণ সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে।
দীর্ঘ সময় কক্ষ তাপমাত্রায় কাঁচা মাংস রাখা ঠিক নয়।
দেশি মুরগি বনাম ফার্মের মুরগি
দেশি মুরগির স্বাদ আলাদা, মাংস কিছুটা শক্ত এবং দাম বেশি। অন্যদিকে ফার্মের মুরগি নরম, দ্রুত রান্না হয় এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
পুষ্টিবিদদের মতে, নিরাপদভাবে উৎপাদিত হলে দুই ধরনের মুরগিই ভালো প্রোটিনের উৎস। তাই শুধু ‘দেশি’ বা ‘ফার্ম’ নয়- নিরাপদ উৎপাদনই আসল বিষয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা
পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে পোলট্রি খামার ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। সরকারি প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বাচ্চা, নিরাপদ খাদ্য এবং নিয়মিত প্রাণিসম্পদ বিভাগের তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সচেতন ভোক্তাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা
ফার্মের মুরগিকে ভয় পাওয়ার আগে জানতে হবে এর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তবতা। গুজব নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ওপর আস্থা রাখাই উচিত। নিরাপদ খামার, দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী, কার্যকর সরকারি নজরদারি এবং সচেতন ভোক্তার সমন্বয়েই নিশ্চিত হতে পারে নিরাপদ পোলট্রি খাদ্য।
শেষকথা
ফার্মের মুরগি আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যেমন সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর, তেমনি অনিয়ম হলে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে। তাই প্রয়োজন আতঙ্ক নয়- তথ্যভিত্তিক সচেতনতা। কারণ নিরাপদ খাবারের শুরু হয় খামার থেকে, আর শেষ হয় আমাদের রান্নাঘরে।