
সাগরক্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর
একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নৌপথে যাতায়াতের প্রাণকেন্দ্র ছিল পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী হুলারহাট লঞ্চঘাট। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে এই ঘাটজুড়ে থাকত যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়, ব্যস্ততা আর কোলাহল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন আর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এখন সেই ব্যস্ততম লঞ্চঘাট অনেকটাই নীরব। লঞ্চ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের দাবি, জেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলেও প্রতিদিন অন্তত একটি লঞ্চ চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে স্টিমার চলাচল শুরুর পর থেকেই হুলারহাট স্টিমারঘাট দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে চালু হয় লঞ্চ চলাচল। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে ঢাকা, বরিশাল, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন রুটে নিয়মিত লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করত এ ঘাট দিয়ে। বিশেষ করে ঈদের সময় ঢাকা-হুলারহাট নৌরুটে ৮ থেকে ১০টি লঞ্চ ও স্টিমারের চলাচল ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে নৌপথে যাতায়াত দ্রুত কমে যায়। সড়কপথ সহজ ও সময়সাশ্রয়ী হওয়ায় যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নেন নৌপথ থেকে। এর প্রভাব পড়ে হুলারহাট নদীবন্দরের ওপরও।
একসময় নদীর ঢেউ, ডেকের আড্ডা আর যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকা ঘাট এখন প্রায় জনশূন্য। লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হোটেল, চায়ের দোকানসহ অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আবার কেউ কেউ পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
লঞ্চঘাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লাল মিয়া বলেন, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী লঞ্চঘাট। একসময় ঈদের সময় ৮ থেকে ১০টি লঞ্চ আসত। তখন প্রতিটি দোকানে ভালো বেচাকেনা হতো। এখন লঞ্চই আসে না। প্রতিদিন অন্তত একটি লঞ্চ চলাচল করলে ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারত।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম মাতুব্বর সাগরকন্যাকে বলেন, একসময় এখান থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি বড় লঞ্চ চলাচল করত। মর্নিং সান, রাজদূত, অগ্রদূত প্লাস, আচলসহ বেশ কয়েকটি লঞ্চ ছিল এই রুটে। এখন লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, হুলারহাট নদীবন্দর একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বন্দর ছিল। এখানে নিয়মিত স্টিমার ও লঞ্চ আসা-যাওয়া করত। অন্তত একটি লঞ্চ নিয়মিত চালু থাকলে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা উপকৃত হতেন।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ বলেন, পিরোজপুর সদরসহ তিনটি উপজেলার নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় হুলারহাট নদীবন্দরকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নৌ চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।
সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও নৌপথের স্মৃতি ও ঐতিহ্য এখনো ভুলতে পারেননি পিরোজপুরের মানুষ। তাই ঐতিহ্যবাহী হুলারহাট লঞ্চঘাটে পুনরায় লঞ্চ চলাচল শুরুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।