আগৈলঝাড়ায় ২৪৬ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত

হোম পেজ » বরিশাল » আগৈলঝাড়ায় ২৪৬ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত
বুধবার ● ১৪ জানুয়ারী ২০২৬


 

আগৈলঝাড়ায় ২৪৬ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ২৪৬ বছরের প্রাচীন মারবেল মেলা বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রামানন্দের আঁক গ্রামে প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন করা হয়।

 

মেলায় শুধু আগৈলঝাড়া উপজেলা নয়, পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়া, উজিরপুর, ডাসার, মাদারীপুর, কালকিনি, গৌরনদী, বানারীপাড়া ও বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন বয়সের হাজারো নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।

 

মেলা কমিটির সভাপতি নির্মল মণ্ডল জানান, রামানন্দের আঁক গ্রামে প্রায় ২৪৬ বছর আগে মা সোনাই চাঁদ আউলিয়ার ছয় বছর বয়সে বিয়ে হয়। সাত বছর বয়সে স্বামী মারা গেলে নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি শ্বশুরবাড়িতে একটি নিমগাছের গোড়ায় শিবের আরাধনা ও পূজা-অর্চনা শুরু করেন। ক্রমে তাঁর অলৌকিকতা ছড়িয়ে পড়লে ওই স্থানে বাৎসরিক পূজার আয়োজন করা হয়। মা সোনাই চাঁদ আউলিয়ার জীবদ্দশায় আনুমানিক ১৭৮০ ইং সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তির দিনে সাংস্কৃতিক গান, বৈষ্ণব সেবা, নিরামিষ ভোজ, নবান্ন উৎসব, মারবেল মেলা ও মারবেল খেলার মাধ্যমে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তাঁর মৃত্যুর পর ওই বাড়িটি এলাকায় ‘মা সোনাই চাঁদ আউলিয়ার বাড়ি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

 

প্রতিবছর এ উপলক্ষে বৈষ্ণব সেবা, নামসংকীর্তন ও কবিগান শেষে সোয়া মণ (৫০ কেজি) চালের গুঁড়া, সোয়া মণ আখের গুড়, ৫০ জোড়া নারকেল ও প্রয়োজনীয় কলাসহ অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে নবান্ন প্রস্তুত করে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম আকর্ষণীয় পৌষ সংক্রান্তিতে বাস্তুপূজা উপলক্ষে দীর্ঘ ২৪৬ বছর ধরে এ গ্রামে মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

 

মারবেল মেলা উপলক্ষে ঢাকা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন শিখা বিশ্বাস। গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে মারবেল খেলতে এসেছেন হরষিদ সরকার, তাপস দাস ও মনমথ মণ্ডল। উজিরপুর উপজেলার হারতা গ্রাম থেকে সবিতা দাস ও অনিতা মধু পরিবারসহ মেলায় অংশগ্রহণ করেন। তারা জানান, মেলায় এসে মারবেল খেলতে পেরে তারা আনন্দিত।

 

মারবেল খেলার ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা চিত্ররঞ্জন বিশ্বাস (৮২) বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা এই খেলার মাধ্যমে মেলার প্রচলন করেছিলেন, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। উত্তরসূরি হিসেবে আমরা এই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

 

এদিনকে ঘিরে রামানন্দের আঁক গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। স্থানীয়রা তাদের মেয়ে-জামাই ও আত্মীয়-স্বজনদের মেলায় আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মারবেল খেলা চলছে। রাস্তার ওপর, বাড়ির আঙিনা, অনাবাদি জমি ও বাগানসহ সর্বত্রই মারবেল খেলার আসর বসেছে।

 

মারবেল মেলা উপলক্ষে রামানন্দের আঁক মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বাঁশ-বেত শিল্পসামগ্রী, মনিহারি, খেলনা, মিষ্টি ও ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসে। কোদালধোয়া গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্র সুমন হালদার ও দশম শ্রেণির ছাত্র নির্মল সরকার জানায়, সারা বছর টাকা জমিয়ে তারা মারবেল খেলার প্রস্তুতি নিয়েছে। শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা মেলার প্রধান আকর্ষণ মারবেল খেলায় অংশগ্রহণ করেন।

 

এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুশংকর মল্লিক সাংবাদিকদের জানান, মারবেলে আগত সাধারণ দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মেলা পরিচালনার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দূরদূরান্ত থেকে আগত মারবেল খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগে থেকেই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:০৯:৫৩ ● ১৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ