সাগরকন্যা আইটি ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, জনবহুল একটি সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাঘ। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। ছবিটি দেখে কেউ বিস্মিত হচ্ছেন, কেউ আবার সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার করছেন। পরে জানা গেল, বাস্তবে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পুরো ছবিটি তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে এআই দিয়ে তৈরি ছবির মানও দ্রুত বদলেছে। একসময় মানুষের হাতে অতিরিক্ত আঙুল, অস্বাভাবিক চোখ কিংবা মুখের বিকৃত গঠন দেখে এসব ছবি সহজেই সন্দেহ করা যেত। এখন সেই ত্রুটি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে এআই। এমনকি বাস্তব পরিবেশ, মানুষের অভিব্যক্তি, আলো-ছায়া ও ছোটখাটো বিবরণও অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে শুধু চোখে দেখে কোনো ছবি আসল, নাকি এআই দিয়ে তৈরি, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ছবি যাচাই না করে বিশ্বাস করলে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কয়েকটি বিষয় পর্যবেক্ষণ এবং কিছু ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করে সন্দেহজনক ছবির সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ছবির অস্বাভাবিক নিখুঁত রূপ
এআই দিয়ে তৈরি ছবির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো অনেক সময় দৃশ্যের সবকিছু অস্বাভাবিক রকম নিখুঁত দেখায়। ব্যস্ত বাজারেও রাস্তা পরিচ্ছন্ন, দোকানের পণ্য সাজানো, মানুষের পোশাকে কোনো ভাঁজ নেই। মুখের ত্বকেও স্বাভাবিক দাগ, বলিরেখা কিংবা খুঁত অনুপস্থিত থাকতে পারে।
কখনো ছবির আলো ও রঙের ব্যবহারও বাস্তবতার তুলনায় অতিরিক্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। সাধারণ রাস্তা, অফিস কিংবা বাজারের দৃশ্যেও বিজ্ঞাপনের মতো আলো-ছায়া দেখা যায়। অবশ্য শুধু অতিরিক্ত নিখুঁত দেখালেই কোনো ছবিকে এআইয়ের তৈরি বলা যাবে না। এটি সন্দেহ করার একটি সূত্র মাত্র।
হাত, আঙুল ও মুখের গঠন
ছবিতে মানুষের হাত ও আঙুল ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। আঙুলের সংখ্যা, দৈর্ঘ্য, অবস্থান এবং হাতের সঙ্গে কবজির সংযোগে অসংগতি আছে কি না দেখুন। কেউ কোনো বস্তু ধরে থাকলে তাঁর আঙুলের অবস্থানও খেয়াল করুন।
একইভাবে মানুষের চোখ, কান, দাঁত ও মুখের গঠন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। একাধিক মানুষের ছবি হলে সবার মুখের বৈশিষ্ট্য অস্বাভাবিকভাবে একই রকম কি না, সেটিও দেখুন।
পেছনের দৃশ্যেও থাকতে পারে অসংগতি
ছবির মূল বিষয়টির দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে অনেকেই পেছনের দৃশ্য খেয়াল করেন না। অথচ এআইয়ের তৈরি ছবিতে পেছনের অংশে নানা অসংগতি থেকে যেতে পারে।
যেমন, কোনো মানুষের মুখ অস্পষ্ট বা বিকৃত, গাড়ির চাকা অসম্পূর্ণ কিংবা দুটি বস্তু অস্বাভাবিকভাবে একটির সঙ্গে অন্যটি মিশে থাকতে পারে। ভবনের জানালা, দরজা, সিঁড়ি কিংবা রাস্তার অন্যান্য উপাদানের গঠনেও ভুল থাকতে পারে। তাই সন্দেহ হলে ছবিটি বড় করে পুরো দৃশ্য পরীক্ষা করুন।
লেখা ও সাইনবোর্ড পরীক্ষা করুন
দোকানের সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বরপ্লেট, পোস্টার কিংবা পোশাকের ওপর থাকা লেখা খেয়াল করুন। এআই দিয়ে তৈরি কিছু ছবিতে অক্ষর এলোমেলো, বানান ভুল কিংবা অর্থহীন শব্দ দেখা যায়। একই অক্ষর বারবার আসতে পারে।
বাংলা লেখার ক্ষেত্রে যুক্তবর্ণ, অক্ষরের গঠন ও বানানে অসংগতি থাকতে পারে। ছবিতে একই প্রতিষ্ঠানের নাম একাধিক জায়গায় থাকলে সেগুলো মিলিয়ে দেখুন।
আলো, ছায়া ও প্রতিফলন মিলিয়ে দেখুন
ছবির আলো ও ছায়ার মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না পরীক্ষা করুন। সূর্যের আলো একদিক থেকে এলে সাধারণত মানুষ ও বস্তুর ছায়া বিপরীত দিকে পড়ে। কিন্তু এআই দিয়ে তৈরি কিছু ছবিতে আলোর উৎসের সঙ্গে ছায়ার অবস্থান মেলে না।
আয়না, জানালার কাচ কিংবা পানিতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতিফলন থাকলে সেটিও পরীক্ষা করুন। প্রতিফলনে মূল দৃশ্যের সঙ্গে অসংগতি আছে কি না, দেখুন।
একই ধরনের অবয়বের পুনরাবৃত্তি
ভিড়ের ছবিতে কয়েকজন মানুষের মুখ প্রায় একই রকম দেখাচ্ছে কি না খেয়াল করুন। বাজারের দোকানে একই ধরনের পণ্য বা ফলের বিন্যাস বারবার দেখা যাচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করুন। ভবনের জানালা, রাস্তার বাতি কিংবা আসবাবের নকশায় অস্বাভাবিক পুনরাবৃত্তি থাকলেও সন্দেহ হতে পারে।
গুগল লেন্সে ছবির পুরোনো উৎস খুঁজুন
ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা বোঝার পাশাপাশি সেটি আগে কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কি না, যাচাই করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে গুগল লেন্স ব্যবহার করা যেতে পারে।
মোবাইলে ছবিটি সংরক্ষণ করে গুগল লেন্সে অনুসন্ধান করুন। ছবিটির সঙ্গে মিল আছে, এমন অন্য ছবি ও ওয়েবসাইট পাওয়া যেতে পারে। একই ছবি আগে কোনো পুরোনো ঘটনা কিংবা অন্য দেশের ঘটনার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করুন।
ধরুন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার ছবি বলে একটি ছবি প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেল, একই ছবি কয়েক বছর আগে অন্য একটি দেশের ঘটনার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। তাহলে ছবিটির সঙ্গে দেওয়া বর্ণনা যে বিভ্রান্তিকর, তা বোঝা সম্ভব।
ছবির প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করুন
ডিজিটাল ছবির সঙ্গে কখনো কখনো কিছু প্রযুক্তিগত তথ্য সংযুক্ত থাকে। যেমন, কোন যন্ত্রে ছবি তোলা হয়েছে, কখন তৈরি হয়েছে কিংবা কোন সফটওয়্যারে সম্পাদনা করা হয়েছে। এসব তথ্যকে সাধারণভাবে মেটাডেটা বলা হয়।
কিছু এআই প্রযুক্তি ছবিতে কনটেন্ট ক্রেডেনশিয়ালসের মতো বিশেষ তথ্যও যুক্ত করে। এর মাধ্যমে ছবির উৎস, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও সম্পাদনার ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে ছবিতে এ ধরনের তথ্য সংযুক্ত না থাকলে যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
এআই শনাক্তকারী ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন
অনলাইনে এমন কিছু ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে ছবি আপলোড করলে সেটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে ফলাফল দেখায়। এসব ব্যবস্থার সাহায্যে সন্দেহজনক ছবির বিষয়ে অতিরিক্ত ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে একটি ওয়েবসাইটের ফলাফলকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে একাধিক শনাক্তকারী ব্যবস্থার ফলাফল তুলনা করুন। ব্যক্তিগত বা গোপনীয় ছবি অপরিচিত ওয়েবসাইটে আপলোড করার আগে ছবির তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নীতি জেনে নিন।
ছবির উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই সবচেয়ে জরুরি
শুধু ছবির ভেতরে অসংগতি খোঁজার চেয়ে অনেক সময় ছবির উৎস যাচাই করা বেশি কার্যকর। ছবিটি কে প্রকাশ করেছেন? কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে কি? যিনি ছবিটি তুলেছেন বলে দাবি করছেন, তাঁর পরিচয় জানা যাচ্ছে কি? একই ঘটনার অন্য কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে কি?
ঘটনার স্থান, সময় ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে খোঁজ নিন। কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ছবি ছড়ালে তাদের যাচাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা কিংবা আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে তথ্য খুঁজুন। বড় কোনো ঘটনা নিয়ে শুধু একটি ছবি ছড়িয়ে পড়লে বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
মনে রাখবেন, একটি পরীক্ষাই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়
এআই দিয়ে তৈরি ছবি শনাক্ত করার এসব পদ্ধতি সহায়ক হলেও কোনোটিই শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয়। ক্যামেরার কোণ, আলো, ছবির মান কিংবা সম্পাদনার কারণে বাস্তব ছবিতেও অস্বাভাবিক কিছু দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে উন্নত এআই প্রযুক্তি এখন অনেক ত্রুটিমুক্ত ছবি তৈরি করতে পারে।
একইভাবে এআই শনাক্তকারী ওয়েবসাইট ভুল ফলাফল দিতে পারে। ছবির প্রযুক্তিগত তথ্যও অনুপস্থিত থাকতে পারে কিংবা পরিবর্তন করা সম্ভব হতে পারে। তাই একাধিক পদ্ধতিতে যাচাই করা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
সব বিভ্রান্তিকর ছবিও এআই দিয়ে তৈরি নয়। বাস্তব ছবি সম্পাদনা করে, পুরোনো ঘটনার ছবি নতুন বলে প্রচার করে কিংবা ছবির সঙ্গে মিথ্যা বর্ণনা জুড়েও মানুষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। আবার এআই দিয়ে তৈরি সব ছবির উদ্দেশ্য প্রতারণা নয়। বিনোদন, শিল্পকর্ম, বিজ্ঞাপন ও সৃজনশীল কাজেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি দেখে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ কিংবা আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আবেগের বশে যাচাই না করে শেয়ার করলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো ছবি শেয়ারের আগে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ছবি সত্য কি না, তা বোঝার জন্য শুধু চোখের ওপর নির্ভর করবেন না। যাচাই করুন ছবির উৎস, সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট। নিশ্চিত না হলে শেয়ার করবেন না।