বরগুনায় নদীভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার, ঝুঁকিতে ৭২ কিলোমিটার বাঁধ

হোম » বরগুনা » বরগুনায় নদীভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার, ঝুঁকিতে ৭২ কিলোমিটার বাঁধ
শনিবার ● ২৪ অক্টোবর ২০২৬


 

বরগুনায় নদীভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার। ছবি- সংগৃহীত

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা

 

বসতভিটা, ঘরবাড়ি আর ফসলি জমি- নদীভাঙনে একে একে সব হারিয়েছেন বরগুনার বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকার সত্তরোর্ধ্ব মোস্তফা মুসল্লী। দুই বছর আগে বিষখালী নদীতে বিলীন হয় তাঁর বসতভিটা। এরপর কালিকাবাড়ি লঞ্চঘাটের পাশে খাসজমিতে ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ছয় মাস আগে সেই ঘরও নদীগর্ভে চলে যায়। এখন অন্যের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটছে তাঁর।

 

একসময় স্ত্রী ও ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে নিজের প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে বসবাস করতেন মোস্তফা। এখন জমিজমা হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

 

মোস্তফার মতো বেতাগীর সরিষামুড়ী ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি এলাকায় গত ছয় মাসে নদীভাঙনে বসতবাড়ি হারিয়েছে ৫০টি পরিবার। গত এক বছরে এ সংখ্যা শতাধিক। নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকায় নতুন করে ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন আশপাশের বাসিন্দারাও।

 

বরগুনার পায়রা ও বিষখালী নদী এবং বলেশ্বর নদের ভাঙনে জেলার ৭২ দশমিক ৫০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাবে, এসব বাঁধের আশপাশে বসবাসকারী প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন।

 

পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ২৬ দশমিক ৯৪৯ কিলোমিটার, পাথরঘাটায় ১৮ দশমিক ৫৫৯ কিলোমিটার, বেতাগীতে ১১ দশমিক ১৬৬ কিলোমিটার, আমতলীতে ৫ কিলোমিটার, তালতলীতে ৩ দশমিক ৫০০ কিলোমিটার এবং বামনায় ৭ দশমিক ৩২৯ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। নদীভাঙনের পাশাপাশি উচ্চ জোয়ারও বাঁধের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

 

নদীভাঙনের ভয়াবহতা দেখা গেছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বামনা উপজেলার দক্ষিণ রামনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিষখালী নদীর ভাঙনে বেড়িবাঁধের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

 

১০ অক্টোবর বেতাগীর কালিকাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর অব্যাহত ভাঙনের মুখে রয়েছে ৮৮ বছরের পুরোনো কালিকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি রক্ষায় ভাঙনস্থলে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

 

২০ অক্টোবর পাথরঘাটার কালমেঘা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ ভেঙে বিষখালী নদীতে চলে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও স্রোতের তোড়ে বাঁধের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

 

২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরে পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেখানে টেকসই বাঁধ নির্মাণ হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, নদীভাঙনে তাঁরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাঁদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় মজবুত বাঁধ নির্মাণ জরুরি।

 

পাথরঘাটার কালমেঘা গ্রামের বাসিন্দা মো. রাজু মিয়ার ঘরবাড়ি ও ১৬ একর জমিজমা বিষখালী নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। এখন তাঁর অবশিষ্ট জমি মাত্র ৪০ শতক। সেখানে বাড়ি করে বসবাস করছেন তিনি।

 

রাজু মিয়া বলেন, ‘বর্তমানে অবশিষ্ট ৪০ শতক জমিতে বাড়ি করে আছি। সেটাও কখন বিষখালী নদী গিলে খাবে বলা যায় না।’

 

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের প্রতি কিলোমিটারে টেকসই ব্লকবাঁধ নির্মাণে প্রায় ৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে ৭২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

 

পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হান্নান প্রধান বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নদীতীর সুরক্ষায় জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলার কাজের জন্য ঢাকায় প্রস্তাব পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৯:১০ ● ৩০ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ