
সাগরকন্যা ইসলামী ডেস্ক
ইসলামে বিয়ে শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং পবিত্র ও আত্মিক বন্ধন। তাই বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনাতেও শরিয়তের বিধান মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে পাত্রপাত্রী খোঁজার ক্ষেত্রে ঘটক, আত্মীয়স্বজন কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমের সহায়তা নেওয়া স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রে পাত্রীর ছবি পরপুরুষের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
ঘটকের কাছে পাত্রীর ছবি দেওয়ার বিধান
পাত্র খোঁজার উদ্দেশ্যে পাত্রীর ছবি ঘটক বা অন্য কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের কাছে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, ছবিটি এমন ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে পারে, যাদের সামনে ওই নারীর ছবি প্রকাশের অনুমতি নেই। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ছবি সহজে সংরক্ষণ, কপি, সম্পাদনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে ব্যক্তিগত ছবি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছড়িয়ে পড়া বা অপব্যবহারের আশঙ্কাও থাকে।
তাই প্রয়োজন ছাড়া পাত্রীর ছবি আদান-প্রদান না করে শরিয়তসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতিতে বিয়ের প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়া অধিকতর সতর্কতার বিষয়।
ছবি ছাড়া কীভাবে পাত্রীর পরিচয় দেওয়া যায়
ঘটক বা মধ্যস্থতাকারীকে পাত্রীর নাম, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, পারিবারিক পরিচয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো যেতে পারে। পাশাপাশি পাত্রীর স্বভাব-চরিত্র, দ্বীনদারি ও পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কেও যথাযথ তথ্য দেওয়া যেতে পারে।
কোনো পাত্রপক্ষ এসব তথ্যের ভিত্তিতে আগ্রহী হলে পরবর্তী পর্যায়ে শরিয়তের বিধান মেনে সরাসরি দেখা ও কথা বলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখা
বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হবু বর ও কনের একে অপরকে দেখার অনুমতি ইসলামে রয়েছে। বরং হাদিসে বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেওয়া উচিত, যা তাকে বিয়েতে আগ্রহী করে তোলে।’
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২)
হজরত মুগিরা ইবনে শোবা (রা.) বলেন, তিনি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ওই নারীকে দেখেছেন কি না। তিনি না দেখার কথা জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
‘তাকে দেখে নিন। কেননা, এটি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অধিক সহায়ক।’
(জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৭)
অর্থাৎ বিয়ের বিষয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে হবু বর শরিয়তের সীমারেখা মেনে পাত্রীকে দেখতে পারেন। একইভাবে পাত্রীও হবু বরকে দেখে নেওয়ার সুযোগ রাখেন।
কারা পাত্রীকে দেখতে পারবেন
বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখার বিশেষ অনুমতি মূলত সম্ভাব্য বরকে কেন্দ্র করে। হবু বরের বাবা, ভাই, চাচা, মামা, বন্ধু বা অন্য কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের সামনে পর্দাহীন অবস্থায় পাত্রীর উপস্থিত হওয়া এই অনুমতির অন্তর্ভুক্ত নয়।
তাই শুধু ‘পাত্রপক্ষ দেখবে’ এমন অজুহাতে পরিবারের একাধিক পুরুষের সামনে পাত্রীকে উপস্থাপন করা বা তাঁর ছবি সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও শরিয়তের অন্যান্য বিধান ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
কুরআনে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ
পর্দা ও দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়ে কুরআনে নারী-পুরুষ উভয়কেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে…।’
(সুরা আন-নূর, আয়াত: ৩০-৩১)
বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইসলামের এই মূলনীতিগুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পাত্রীর ছবি অপ্রয়োজনে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়া এবং আগ্রহ তৈরি হলে শরিয়তসম্মতভাবে বর-কনের দেখাসাক্ষাতের ব্যবস্থা করাই অধিক নিরাপদ ও শালীন পন্থা।
এভাবে বিয়ের শুরুতেই পর্দা, সম্মান ও শরিয়তের বিধান রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে ব্যক্তিগত ছবি অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমানো যায়।