ফোন কীভাবে একঝলকেই চিনে ফেলে আপনাকে

হোম » প্রযুক্তি » ফোন কীভাবে একঝলকেই চিনে ফেলে আপনাকে
রবিবার ● ২৩ আগস্ট ২০২৬


 

প্রতীকী ছবি চিত্র

সাগরকন্যা আইটি ডেস্ক

 

ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সেটি আনলক হয়ে যায়। কোনো পাসওয়ার্ড লিখতে হয় না, কোনো বোতামও চাপতে হয় না। মাত্র এক মুহূর্ত ক্যামেরার দিকে তাকানো, আর ফোন যেন আপনাকে চিনে ফেলে! শুধু ফেস আনলক নয়, ছবি তোলার সময়ও একই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়। ক্যামেরা চালু করলেই মানুষের মুখের চারপাশে ছোট একটি বক্স দেখা যায়। আপনি মাথা একটু এদিক-ওদিক করলেও বক্সটি আপনার মুখের সঙ্গে সঙ্গে নড়তে থাকে।

 

কিন্তু একটি ছোট ক্যামেরা কীভাবে এত দ্রুত বুঝে যায়, ছবির কোন অংশে মানুষের মুখ রয়েছে? কীভাবে বোঝে, সেই মুখটি ফোনের মালিকের কি না? এর পেছনে কাজ করে কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং বিশেষায়িত প্রসেসিং প্রযুক্তির সমন্বয়।

 

ক্যামেরার কাছে মুখ আসলে কী?

 

মানুষ যখন কোনো ছবি দেখে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক খুব সহজেই মানুষের মুখ চিনতে পারে। কিন্তু ক্যামেরা মানুষের মতো করে কিছু ‘দেখে’ না। ক্যামেরা প্রথমে চারপাশের আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর সেই তথ্য অসংখ্য ছোট ছোট পিক্সেল হিসেবে তৈরি হয়। প্রতিটি পিক্সেলে থাকে রং, উজ্জ্বলতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের তথ্য।

 

অর্থাৎ ক্যামেরার কাছে মানুষের মুখ প্রথমে একটি ছবির মধ্যে থাকা অসংখ্য সংখ্যার সমষ্টি। এই সংখ্যাগুলোর মধ্য থেকে মুখের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও প্যাটার্ন খুঁজে বের করার কাজটি করে কম্পিউটার ভিশনভিত্তিক অ্যালগরিদম ও এআই মডেল।

 

এআই কীভাবে বুঝতে পারে কোথায় মুখ?

 

এখানেই আসে মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিংয়ের ভূমিকা। একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণের সময় তাকে মানুষের মুখের অসংখ্য ছবি দেখানো হয়। এসব ছবি বিশ্লেষণ করতে করতে মডেলটি মুখের বিভিন্ন সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ধরন শিখে নেয়।

 

যেমন চোখের অবস্থান, নাক ও মুখের আপেক্ষিক অবস্থান, চোয়ালের রেখা এবং মুখের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক। তবে আধুনিক এআই শুধু দুটি চোখ, একটি নাক ও একটি মুখ খুঁজে মানুষের মুখ শনাক্ত করে না। নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এটি আরও জটিল গাণিতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে।

 

ফলে ক্যামেরার সামনে কেউ দাঁড়ালে এআই খুব দ্রুত নির্ধারণ করতে পারে, ছবির কোন অংশে মানুষের মুখ থাকার সম্ভাবনা বেশি।

 

ফেস ডিটেকশন আর ফেস ভেরিফিকেশন এক নয়

 

স্মার্টফোনে মুখ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ- ফেস ডিটেকশন এবং ফেস ভেরিফিকেশন।

 

ফেস ডিটেকশন হলো ছবির মধ্যে কোথায় মানুষের মুখ রয়েছে, তা শনাক্ত করা। যেমন আপনি ক্যামেরা চালু করলেন এবং স্ক্রিনে তিনজন মানুষের মুখের চারপাশে তিনটি বক্স দেখা গেল। এটি ফেস ডিটেকশনের উদাহরণ।

 

অন্যদিকে ফেস ভেরিফিকেশন হলো একটি মুখ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা। অর্থাৎ ডিটেকশন বলছে, ‘এখানে একটি মুখ আছে’; আর ভেরিফিকেশন যাচাই করছে, ‘এই মুখটি কি অনুমোদিত ব্যক্তির?’

 

ফেস রিকগনিশন শব্দটি আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোনো ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কে সেই ব্যক্তি, তা নির্ধারণের কাজও বোঝাতে পারে। আর ফোন আনলকের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রশ্নটি হয়- এই মুখটি কি আগে অনুমোদিত মুখটির সঙ্গে যথেষ্ট মেলে?

 

ফেস আনলকের সময় কী ঘটে?

 

আপনি যখন প্রথমবার ফোনে ফেস আনলক সেটআপ করেন, তখন ডিভাইস আপনার মুখের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এতে মুখের দ্বিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি গভীরতা বা ত্রিমাত্রিক গঠনের তথ্যও ব্যবহার করা হতে পারে।

 

পরবর্তী সময়ে ফোনের দিকে তাকালে সিস্টেম আপনার মুখ শনাক্ত করে এবং সংগৃহীত তথ্যকে আগে সংরক্ষিত মুখের প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে তুলনা করে। এটি সাধারণত একটি ছবি আরেকটি ছবির সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে দেখার মতো সরল প্রক্রিয়া নয়। বরং মুখের বৈশিষ্ট্যগুলোকে গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করে তাদের মধ্যে মিল নির্ণয় করা হয়।

 

সিস্টেম যদি নির্ধারিত সীমার মধ্যে যথেষ্ট মিল খুঁজে পায় এবং অন্যান্য নিরাপত্তা শর্তও পূরণ হয়, তাহলে ফোন আনলক হয়ে যায়।

 

অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা এ রকম- মুখ শনাক্তকরণ, বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ, সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে যাচাই এবং অনুমোদন মিললে ফোন আনলক।

 

এই পুরো কাজটি এত দ্রুত ঘটে যে আমাদের মনে হয়, ফোন যেন একঝলক তাকিয়েই আমাদের চিনে ফেলেছে!

 

মাথা নাড়ালেও ক্যামেরা মুখ অনুসরণ করে কীভাবে?

 

ক্যামেরা একবার মুখ খুঁজে পেয়েই থেমে যায় না। ভিডিও বা লাইভ ক্যামেরা ব্যবহারের সময় পরপর অনেকগুলো ফ্রেম তৈরি হয়। প্রথম দিকে একটি ফ্রেমে এআই আপনার মুখের অবস্থান শনাক্ত করার পর পরবর্তী ফ্রেমগুলোতে সেই তথ্য ব্যবহার করে মুখটি কোথায় থাকতে পারে, তা দ্রুত অনুমান করা যায়।

 

ফলে প্রতিটি ফ্রেমে পুরো ছবির মধ্যে একেবারে শুরু থেকে মুখ খোঁজার প্রয়োজন হয় না। এ কারণেই আপনি মাথা একটু ঘোরালেও বা নড়াচড়া করলেও ক্যামেরার ফেস-ট্র্যাকিং বক্সটি আপনার মুখের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে।

 

মুখের কোন অংশগুলো দেখে এআই?

 

অনেক আধুনিক সিস্টেম মুখের বিভিন্ন ফেসিয়াল ল্যান্ডমার্ক শনাক্ত করতে পারে। চোখ, নাক, ঠোঁট, চোয়ালসহ মুখের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুর অবস্থান বিশ্লেষণ করে এআই মুখের গঠন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে।

 

এর মাধ্যমে ক্যামেরা বুঝতে পারে, মুখটি সোজা আছে, কিছুটা ঘোরানো হয়েছে নাকি অন্য কোনো কোণে রয়েছে। এই প্রযুক্তি শুধু ফেস আনলকের জন্য নয়; ছবি তোলার সময় অটোফোকাস, এক্সপোজার, পোর্ট্রেট মোড এবং বিভিন্ন ক্যামেরা ইফেক্টেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

যমজ হলে কি ফেস আনলক বিভ্রান্ত হতে পারে?

 

এটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক একটি প্রশ্ন। এর উত্তর নির্ভর করে ফোনে ব্যবহৃত ফেস আনলক প্রযুক্তির ধরন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।

 

কিছু ডিভাইস মূলত সামনের ক্যামেরা ও সফটওয়্যারভিত্তিক পদ্ধতিতে মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। যমজদের মুখের গঠন অনেকটা কাছাকাছি হওয়ায় কিছু সিস্টেমের ক্ষেত্রে তাদের আলাদা করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।

 

অন্যদিকে উন্নত ফেস আনলক ব্যবস্থায় ইনফ্রারেড প্রযুক্তি, ডেপথ সেন্সিং বা ত্রিমাত্রিক ফেস ম্যাপিং ব্যবহার করা হতে পারে। এসব পদ্ধতিতে শুধু মুখের সামনের দ্বিমাত্রিক ছবি নয়, মুখের গভীরতা ও ত্রিমাত্রিক গঠনের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া যায়। ফলে একই রকম দেখতে ব্যক্তিদের আলাদা করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

 

তবে কোনো ফেস আনলক ব্যবস্থাকেই সব পরিস্থিতিতে শতভাগ নিখুঁত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ফোনের মডেল, ব্যবহৃত সেন্সর, সফটওয়্যার এবং নিরাপত্তা নকশার ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করে।

 

এত দ্রুত কাজ করে কীভাবে?

 

এখানে শুধু এআই সফটওয়্যার নয়, স্মার্টফোনের হার্ডওয়্যারও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক অনেক স্মার্টফোনের প্রসেসরে এআইভিত্তিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষায়িত হার্ডওয়্যার থাকতে পারে। এর মধ্যে এনপিইউ বা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট উল্লেখযোগ্য।

 

এনপিইউ মূলত মেশিন লার্নিং ও এআইয়ের নির্দিষ্ট ধরনের গণনামূলক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তৈরি। ফলে মুখ শনাক্তকরণ, চিত্র বিশ্লেষণ কিংবা অন্যান্য এআইভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে ডিভাইস আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

 

এ ধরনের কাজের বড় একটি অংশ ফোনের ভেতরেই সম্পন্ন হতে পারে। ফলে প্রতিটি সাধারণ ফেস ডিটেকশন বা ট্র্যাকিংয়ের জন্য তথ্য ইন্টারনেটে পাঠিয়ে ফলাফল ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হয় না।

 

সব ফেস আনলক কি সমান নিরাপদ?

 

না। সব স্মার্টফোন একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে না, তাই সব ফেস আনলকের নিরাপত্তাও এক নয়।

 

কিছু ডিভাইস মূলত সামনের ক্যামেরা ও সফটওয়্যারভিত্তিক পদ্ধতিতে মুখ যাচাই করে। আবার কিছু উন্নত সিস্টেম মুখের গভীরতা, ইনফ্রারেড তথ্য বা ত্রিমাত্রিক গঠনও বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে বিভিন্ন ডিভাইসের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তার মাত্রায় পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।

 

এ ক্ষেত্রে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুখের বৈশিষ্ট্য একজন মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য। তাই কোনো ডিভাইস কীভাবে বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ করে, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।

 

একঝলক তাকানোর আড়ালে যে বিশাল প্রযুক্তি

 

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা যখন ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকাই, তখন এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রায় কিছুই চোখে পড়ে না। অথচ সেই মুহূর্তে একাধিক ধাপ একসঙ্গে কাজ করছে।

 

আলো থেকে পিক্সেল তৈরি হচ্ছে। সেই পিক্সেল থেকে সফটওয়্যার ও এআই মুখের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করছে। মুখ শনাক্ত হচ্ছে, প্রয়োজন হলে ফেসিয়াল ল্যান্ডমার্ক ও গভীরতার তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, অনুমোদিত মুখের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে এবং সবশেষে নিরাপত্তা শর্ত পূরণ হলে খুলে যাচ্ছে ফোনের স্ক্রিন।

 

অর্থাৎ আমাদের কাছে ফেস আনলক হয়তো কেবল একঝলক তাকানো। কিন্তু সেই একঝলকের আড়ালে চলছে ক্যামেরা, কম্পিউটার ভিশন, মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং বিশেষায়িত প্রসেসিং প্রযুক্তির অসাধারণ সমন্বয়।

 

সূত্র: গুগল এমএল কিট, অ্যাপল সাপোর্ট ও নিস্ট ডট গভ ডটকম

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৪:৪৫ ● ১৭ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ