
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক হয়রানি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসানের কাছে তাদের অভিযোগ তুলে ধরে। ইউএনও শিক্ষার্থীদের কথা শোনেন এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন।
ইউএনও জানান, তিনি ইতোমধ্যে পৃথকভাবে দুই দফা বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করেছেন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ায় বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুবেদ সরকারকে আহ্বায়ক, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সৈয়দ আজমল হোসেনকে সদস্য সচিব এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও একাডেমিক সুপারভাইজারকে সদস্য করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে চার কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনওর আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা উপজেলা পরিষদ চত্বর ত্যাগ করে।
এদিকে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পৌনে ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কোনো শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষক মিলনায়তনে কয়েকজন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী উপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষকের কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল।
প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শিক্ষকদের হাজিরা নিয়ে হাজিরা খাতা তাঁর কক্ষে রেখে কক্ষটি তালাবদ্ধ করে তিনি ইউএনওর বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেছেন।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানান, তাদের স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে এবং সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে ইউএনও মো. হাসিবুল হাসান দুই দফা বিদ্যালয়ে সরেজমিনে তদন্তে আসেন। এ সময় তিনি অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অভিযোগের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক হয়রানি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি নারী শিক্ষকদের পোশাক নিয়ে প্রকাশ্যে কটূক্তি ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় কয়েকজন শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখারও অভিযোগ করেছেন তারা।
তাদের আরও অভিযোগ, বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রসিদ ও যথাযথ ভাউচার ছাড়াই বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তার যথাযথ হিসাবও উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।
এ ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত ও পুনর্বহালের সুযোগ দেখিয়ে অর্থ দাবি, ফারজানা আক্তার নিপা নামে একজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ এবং তাঁর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। এসব কোচিং কার্যক্রম থেকে প্রধান শিক্ষক নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে নিতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা একটি মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, তদন্তে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে না রেখে প্রধান শিক্ষক নিজের একক নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, টেস্ট পরীক্ষায় পাঁচ, ছয় বা সাত বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয় থেকে টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি ও আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং করানোর নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় এবং কোচিং কার্যক্রমে যুক্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করে পুরো অর্থের ব্যবস্থাপনা প্রধান শিক্ষক নিজেই করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের সংস্কার, প্রচার ও অন্যান্য কাজের কথা বলেও শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি, এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
তবে প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইউএনওর কাজ ইউএনও করবেন, আর আমি আমার কাজ করব।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, ‘শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন তদন্তকালে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি অভিযোগগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে আগামী চার দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’